জুলাই অভ্যুত্থানের শিক্ষার্থীদের নতুন দল গঠনের তিন দিন আগে তাদের নতুন ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটল।
তবে বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে নতুন এই ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশের আয়োজন ম্লান হয়ে গেছে মারামারিতে।
কমিটি ঘোষণার আগেই দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি বাধে।
মূলত কমিটিতে স্থান পাওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দ্বন্দ্ব থেকে এই মারামারি বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে।
এই হট্টগোলের মধ্যে বিকালে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে নতুন ছাত্র সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাদের স্লোগান ঠিক হয়েছে ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট, বাংলাদেশ ফার্স্ট’।
নতুন ছাত্র সংগঠনের আহ্বায়ক ঘোষণা করা হয়েছে আবু বাকের মজুমদার। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন জাহিদ আহসান। মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদাসসির এবং মুখপাত্র আশরেফা খাতুন।
এছাড়া তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়ামকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রিফাত রশীদকে জ্যেষ্ঠ সদস্য সচিব ঘোষণা করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দুল কাদের এবং সদস্য সচিব হয়েছেন মাহির আলম।
এছাড়া লিমন মাহমুদ হাসানকে এই শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এবং আল আমিন সরকারকে জ্যেষ্ঠ সদস্য সচিব ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্য সংগঠক হয়েছেন হাসিব আল ইসলাম, মুখপাত্র হয়েছেন রাফিয়া রেহনুমা হৃদি।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক বাকের মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
জাহিদ আহসানও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। এখন তিনি ওই প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সম্পাদক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ তিনি আহ্বায়ক বাকেরের চেয়ে এক ব্যাচ সিনিয়র।
তাহমিদ আল মুদাসসির ও আশরেফাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়া কাদেরও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে ৯ দফা ঘোষণা করে আলোচিত তিনি।
কাদের ও মহির দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। হাসিব ও হৃদি ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তারাও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদে পদ পাওয়াদের অধিকাংশই ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র নেতা ছিলেন। কেউ কেউ ছাত্র অধিকার পরিষদ করতেন।
ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর নেতৃত্বাধীন ছাত্র অধিকার পরিষদ ভেঙে কয়েক বছর আগে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি সংগঠনটি গড়ে তুলেছিলেন ডাকসুর সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক আখতার হোসেন।
নুরের এক সময়ের অনুসারী আখতার ছিলেন ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক, সদস্য সচিব ছিলেন নাহিদ ইসলাম।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০১৮ সালে নুরের নেতৃত্বে হয়েছিল আন্দোলন। সেই আন্দোলনের কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কোটা তুলে দিয়েছিল।
গত বছরের জুন মাসে হাই কোর্ট যখন এক রায়ে কোটা ফিরিয়ে আনে, তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্ল্যাটফর্ম গড়ে আন্দোলনে মূল ভূমিকা রাখেন ছাত্রশক্তির নেতারা।
সেই আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর অবস্থানে ব্যাপক রক্তক্ষয়ের পর তা অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তাতে গত বছরের ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে নাহিদসহ তিনজন ছাত্রনেতা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক কমিটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেয়।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে সমাবেশের মধ্য দিয়ে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। সেই দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব নিতে মঙ্গলবার উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন নাহিদ। নতুন দলের সদস্য সচিব হিসাবে আখতারের নাম আলোচনায় রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের তিন দিন আগে ছাত্র সংগঠনের যাত্রা শুরু করল অভ্যুত্থানকারী শিক্ষার্থীরা। তবে তারা বলেছেন, মূল দলের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনের সরাসরি কোনও যোগাযোগ থাকবে না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সাংগঠনিক কাঠামোর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। গঠিত হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও থাকবে না কোনও সম্পর্ক।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক একটি ছাত্র সংগঠন হিসাবে এই সংগঠন কাজ করবে বলে জানান বাকের মজুমদার।
তিনি তার ফেইসকবুক পেইজে মঙ্গলবারই ঘোষণা দেন- ‘নতুন ছাত্রসংগঠনের ঘোষণা আগামীকাল বিকাল ৩টায়। স্থান: মধুর ক্যান্টিন’।
তবে দুপুরের আগেই মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা। সেই জমায়েতে থাকা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুই দফা মারামারি হয়। সেই কারণে ৩টার সংবাদ সম্মেলন করতে করতে ৫টা বেজে যায়।
বিকাল ৪টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের সামনে একবার দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়। এসময় বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সব পদ নিয়েছেন দেখে তারা প্রতিবাদ করছিলেন, তখন তাদের ওপর হামলা হয়।
বিকাল সোয়া ৫টার দিকে বাকের মজুমদার যখন মধুর ক্যান্টিনে নতুন দল এবং পদ পাওয়াদের নাম ঘোষণা করেন, তখনও বিক্ষুব্ধ কয়েকজন পাল্টা স্লোগান তুলছিল।
সংবাদ সম্মেলনের পর নতুন সংগঠনের প্রথম মিছিল মল চত্বরের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানে আবার মারামারি বাধে।