পাকিস্তান সরকার গত বছর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রযুক্তি ন্যাশনাল ফায়ারওয়াল বসানোর কাজ শুরু করলে দেশটির মানুষ নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ পেতে বাধার সম্মুখীন হয়।
এর জেরে গত জানুয়ারিতে অনেক পাকিস্তানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইলন মাস্ককে ট্যাগ করে অনুরোধ জানান, তিনি যাতে তার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সরবরাহকারী স্টারলিংকের সেবা পাকিস্তানে চালু করেন।
স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ করে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে কাজ করতে সক্ষম।
পাকিস্তানি নাগরিকদের ওই অনুরোধের জবাবে মাস্ক জানিয়েছিলেন, স্টারলিংকের মূল কোম্পানি স্পেসএক্স পাকিস্তানে পরিষেবা চালু করতে দেশটির সরকারের অনুমতির অপেক্ষায় আছে।
সেই অপেক্ষা এখন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর তার নানা ধরনের হুমকিতে এরই মধ্যে তটস্থ হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। আস্থাভাজন মিত্র মাস্কের চিন্তা-দর্শনের ওপর ভর করে ট্রাম্প যে বিশ্বব্যাপী তার পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, তা এখন বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট।
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে ভূ-রাজনীতি কেমন রূপ নেবে, এনিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। পাকিস্তানও এর বাইরে নেই। তার ওপর মাস্কের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন আলাদা করে ভাবাচ্ছে পাকিস্তান সরকারকে।
২৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ পাকিস্তান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। তবে পাকিস্তানে এক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ লাখের কম হওয়ায় এর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সেসময় বড় ধরনের কোনও প্রভাব পড়েনি।
যোগাযোগমাধ্যমটি ২০২২ সালের শেষ দিকে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে কিনেছিলেন মাস্ক।
যুক্তরাজ্যে শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলা নিয়ে সম্প্রতি এক্সে কথা বলেন মাস্ক। এক দশকের বেশি সময় আগের এসব ঘটনায় মামলার আসামিদের মধ্যে পাকিস্তানি পুরুষরাও আছে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার ও মাস্কের সম্পর্কে পরীক্ষা হিসেবে হাজির হয়েছে স্টারলিংক।
জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন
গত জানুয়ারিতে ভারতের আইনপ্রণেতা প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী যুক্তরাজ্যে শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মাস্কের করা পোস্টে ‘এশিয়ান’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ঘটনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে পাকিস্তানি পুরুষরা।
এর প্রতিক্রিয়ায় প্রিয়াঙ্কার বক্তব্যকে সমর্থন জানান মাস্ক।
এ ঘটনায় মাস্কের ওপর ক্ষুব্ধ হন পাকিস্তানি আইনপ্রণেতারা। তারা শর্ত দেন, স্টারলিংককে লাইসেন্স দেওয়ার আগে মাস্ককে তার পোস্টের জন্য পাকিস্তানের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্টারলিংকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পাকিস্তান কি ব্যবসায়িক ও জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেবে, না কি মাস্ক-ট্রাম্পের সম্পর্ক বিবেচনায় নেবে?
এ বিষয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) আইনপ্রণেতা আহমেদ আতিক আনোয়ার আল জাজিরাকে বলেন, “এটি ইন্টারনেট অবকাঠামো ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়।”
তিনি বলেন, “স্টারলিংক পাকিস্তানের দূরবর্তী এলাকাগুলোর জন্য উপকারী হতে পারে, যেখানে ফাইবার অপটিক কেবল বসানো সম্ভব নয়।
“তবে পাকিস্তানে কাজ করতে আসা যেকোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে দেশটির আইন ও নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। এখানে জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
আনোয়ার বলেন, “পাকিস্তানকে তার স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। আমরা ডেটা সুরক্ষা, গোপনীয়তা ও এনক্রিপশনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
“দেশের অগ্রগতির জন্য আধুনিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে আইন মেনে কাজ করাও জরুরি।”
অনুমোদনের অপেক্ষা
২০২১ সালের জুন থেকে স্টারলিংক পাকিস্তানে নিবন্ধিত। তবে এটিকে সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করতে হলে দেশটির কর্তৃপক্ষের আরও অনুমোদনের দরকার রয়েছে।
এই অতিরিক্ত অনুমোদন নিয়ে আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন পাকিস্তান টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের (পিটিএ) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “প্রথমত স্টারলিংককে পাকিস্তান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসিপি) কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। এটি তারা এরই মধ্যে নিয়েছে।
“এরপর স্টারলিংককে পাকিস্তান স্পেস অ্যাকটিভিটিজ রেগুলেটরি বোর্ড (পিএসএআরবি) থেকে অনুমোদন নিতে হবে। তারপর তাদের পাকিস্তান টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের (পিটিএ) কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আসতে হবে।”
“স্টারলিংকের আবেদন বর্তমানে পাকিস্তান স্পেস অ্যাকটিভিটিজ রেগুলেটরি বোর্ডে পর্যালোচনা করা হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে স্পেসএক্সকে প্রশ্ন করা হলে তারা কোনও সাড়া দেয়নি।
তবে পিটিএর ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, স্টারলিংকের সেবা পাকিস্তানে চালু করার বিষয়ে সাবধানতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
সাবধানতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “এসব স্যাটেলাইট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ তাদের ফ্রিকোয়েন্সি অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে পারে না, যারা আগে থেকেই কক্ষপথে রয়েছে।
“মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, পাকিস্তানকে সেবা দানকারী বিদ্যমান স্যাটেলাইটগুলোর কার্যক্রমে কোনও ব্যাঘাত যাতে না ঘটে।”
যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কে প্রভাব
স্টারলিংক নিয়ে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন পিএমএল-এন নেতা আহমেদ আতিক আনোয়ার।
তিনি বলেন, “মূল বিষয় হচ্ছে, শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে হস্তক্ষেপ করে।
“এটা আমরা ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় দেখেছি। ৯/১১-এর পর যখন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্ত করে, তখনও আমরা দেখেছি।”
“আর্থিক বিষয় বরাবরই জাতীয় স্বার্থ থেকে আলাদা,” যোগ করেন পিএমএল-এন নেতা আতিক আনোয়ার।
একই ধরনের কথা বলেন ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কান্দিল আব্বাস।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্পের উপদেষ্টার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনও পদে নেই মাস্ক। তিনি ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পাকিস্তানকে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হবে।”
কান্দিল আব্বাস বলেন, “ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে মাস্ক শেষ পর্যন্ত টিকে যাবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসনে তার ভূমিকা নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে এবং তার কয়েকটি পদক্ষেপ বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।
“এসব বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তানকে অবশ্যই মাস্কের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর জোর দিতে হবে, রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়।”