এডিপি কাটছাঁট, কমল ৩০ হাজার কোটি টাকা
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:১৫:০০
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক শূন্য চার শতাংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও এই কাটছাঁটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এবার অনেকটা আগেই এডিপি কমানো হলো। অর্থ বছরের ছয় মাস বা অর্ধেকের মাথায় এসেই মূল এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কেটে নেওয়া হলো।
এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য এখন সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আকার দাঁড়াল ২ লাখ কোটি টাকা।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নেওয়া হয়েছিল। এর মানে হলো, এবার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমেছে।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পসহ সব মিলিয়ে এডিপির আকার হলো ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হয় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।
আর মূল এডিপিতে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে আছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। সংশোধিত এডিপিতে ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প আছে।
সবচেয়ে বড় কোপ পড়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বড় ১০টি প্রকল্প থেকে সব মিলিয়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি কমানো হয়েছে। শীর্ষ ১০টি প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ কমছে না। আর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বরাদ্দ বাড়ছে। আর বাকি আটটি প্রকল্পের বরাদ্দ করা টাকা কমানো হচ্ছে।
বরাদ্দ কমানোর বড় প্রকল্পের তালিকায় আছে মেট্রোরেল (এমআরটি-৬); মেট্রোরেল (এমআরটি-১); এমআরটি-৫ উত্তরাংশ; সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ; ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক নির্মাণ; মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন; হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, "এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল, সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের (২০২৫-২৬) মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।”
তিনি বলেন, "এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
“সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না, সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকার।"
অনিশ্চয়তায় অর্থনীতিতে মন্দাভাব
সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হতো। তবে প্রবাসী আয় আগের চেয়ে বেশি আসছে’
তবে অর্থনীতির মন্দাভাবের কারণে এডিপি কমানো হয়নি বলে জানান তিনি।
এবার কেন এডিপি বাস্তবায়নের গতি কম, এমন প্রসঙ্গে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “দুর্নীতির কারণে পুরোনো প্রকল্প পরিচালকদের অনেককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নতুন প্রকল্প নিয়োগ করতে সময় লেগেছে। এ ছাড়া অনেক প্রকল্প সংশোধন করতেও সময় লেগেছে। দরপত্রের নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। এসব কারণে এবার অন্যবারের চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হচ্ছে।”
এ ছাড়া ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এনইসি সভার কিছু সিদ্ধান্তের কথাও জানান। যেমন—প্রকল্প পরিচালকদের পুল গঠন; স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের খরচ ৫০ কোটি টাকার মধ্যে হলে পরিকল্পনামন্ত্রী বা উপদেষ্টা পাস করতে পারবেন এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে একনেকে পাঠাতে হবে।
এডিপির জন্য প্রকল্পঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সরকারের সময়ে প্রকল্পের হিড়িক লেগে যেত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তা হয়নি। যাচাই–বাছাই করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। অনেক মন্ত্রণালয় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠাচ্ছে না।”
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, “শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে বিদেশি ঋণ নিয়ে কোনো দেশ উন্নতির দিকে গেছে, এমন নজির নেই। এত দিন উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের প্রস্তাব থাকলেই তা নেওয়া হতো। কিন্তু আমাদের উন্নয়নকৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হতো না।”
পায়রা বন্দর, মেট্রোরেলসহ বেশ কিছু প্রকল্পের অর্থ খরচ কীভাবে হবে, প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেই সম্পর্কে পরবর্তী সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি জানান।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প নিয়েও কথা বলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
তিনি বলেন, “প্রকল্পটি কী করা হবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। প্রকল্পটির অবকাঠামো ভেঙে ফেলতেও ২ হাজার কোটি টাকা লাগবে।”