Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

পাকিস্তানের ঝলমলে বিমানবন্দরটি কার জন্য

বেলুচিস্তানের উপকূলীয় শহর গওদারে নির্মিত বিমানবন্দর।
বেলুচিস্তানের উপকূলীয় শহর গওদারে নির্মিত বিমানবন্দর।
[publishpress_authors_box]

নিউ গওদার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। পাকিস্তানের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিমানবন্দর। বেলুচিস্তানের উপকূলীয় শহর গওদারে ৪ হাজার ৩০০ একর জমির ওপর ২৪ কোটি ডলারে এটি তৈরি করা হয়েছে। নির্মাণের পুরো খরচই দিয়েছে চীন।

২০২৪ সালে বিমানবন্দরের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কবে এর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। তার মধ্যে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত এখন এই বিমানবন্দর।

দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অন্যতম দরিদ্র প্রদেশ। এমন জায়গায় এত টাকা খরচ করে বিমানবন্দর নির্মাণের কারণ কী? কারাই বা এটি ব্যবহার করবে? বেলুচিস্তানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তো উড়োজাহাজে চড়ার মতো সামর্থ্যবান নয়। তার ওপর প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তৎপর। তাহলে কার স্বার্থে এটি নির্মিত?

স্বার্থের প্রশ্ন উঠলে চোখ যাবে চীনের দিকে। গত এক দশক ধরে বেলুচিস্তান ও গোয়াদরে সমানে অর্থ ঢালছে দেশটি। কারণ চীন তার পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করতে একটি মাল্টিবিলিয়ন ডলার প্রকল্পের অংশ হিসেবে বেলুচিস্তান ও গোয়াদরে বিনিয়োগ করছে।

এই প্রকল্পকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সংক্ষেপে সিপিইসি বলা হয়।

পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ গোয়াদরে বিমানবন্দর নির্মাণকে রূপান্তরকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখলেও বাস্তবে শহরটিতে পরিবর্তনের কোনও ছাপ দেখা যাচ্ছে না।

গওদার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত নয়। এখানে বিদ্যুৎ আসে প্রতিবেশী দেশ ইরান ও সৌরশক্তি থেকে। এমনকি এই শহরে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।

শহরটির ৯০ হাজার বাসিন্দার জন্য এমন বিমানবন্দরের দরকার ছিল না। তারপরও চীনের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এই ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, আলোচনা এমনটাই।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আজিম খালিদ বলেন, “বিমানবন্দরটি পাকিস্তান বা গোয়াদরের জন্য বানানো হয়নি। চীনের জন্য নির্মাণ করা হয়, যাতে তারা তাদের নাগরিকদের গোয়াদর ও বেলুচিস্তানে নিরাপদে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে।”

গওদারে ৪ হাজার ৩০০ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় বিমানবন্দরটি।

বিচ্ছিন্নতাবাদী-সেনাবাহিনী সংঘাত

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প বেলুচিস্তানে দীর্ঘমেয়াদী বিদ্রোহের সূচনা করে, যেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটি।

বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভিযোগ, পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করছে। বিদেশি শক্তি এবং রাষ্ট্রের হাতে এই সম্পদ চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।

এ কারণে তারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও চীনা শ্রমিকদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করছে। শুধু বেলুচিস্তানেই নয়, পাকিস্তানের অন্যান্য জায়গাও তারা হামলার লক্ষ্য।

পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বেলুচ জাতিগোষ্ঠীর ভাষ্য, তারা দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দেশের অন্য এলাকার বাসিন্দাদের যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তা তাদের দেওয়া হয় না।

পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে যাচ্ছে।

গওদারের চিত্র

গওদার একটি সাধারণ কিন্তু মনোমুগ্ধকর শহর। এখানকার খাবার বেশ সুস্বাদু। স্থানীয়রা অতিথিপরায়ণ, বন্ধুত্বপূর্ণপরায়ণও।

তবে গওদার সফর করা বিপজ্জনক বা কঠিন। কারণ শহরের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর থেকে কেবল একটি বাণিজ্যিক রুট চালু রয়েছে, যা সপ্তাহে তিনবার পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর করাচিতে যাতায়াত করে।

গওদার থেকে বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী কোয়েটা বা দেশের রাজধানী ইসলামাবাদে যাওয়ার সরাসরি কোনও ফ্লাইট নেই।

পাঁচ দশক আগে বেলুচরা বিদ্রোহ শুরু করলে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বেলুচিস্তানে কেউ রাষ্ট্রীয় শোষণ বা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে আটক করা হয়। তাকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া হয়।

অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বেলুচরা গুম ও নির্যাতনের শিকার।

নিরাপত্তা শঙ্কায় ভার্চুয়াল উদ্বোধন

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে নিউ গওদার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট উদ্বোধনের তারিখ বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে আশপাশের পাহাড় থেকে হামলা হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

এ কারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিমানবন্দরটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী ফ্লাইট সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল না।

রাজনৈতিক দল বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির জেলা সভাপতি আব্দুল গফুর হথ বলেন, “বিমানবন্দরটি নির্মাণের সময় গওদারের একজন বাসিন্দাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমনকি দারোয়ান হিসেবেও এখানকার কাউকে রাখা হয়নি।”      

তার প্রশ্ন, এত বড় প্রকল্পে স্থানীয় বেলুচদের কাজ করার সুযোগ কেন দেওয়া হয়নি, যা তাদের উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আজিম খালিদ বলেন, “পাকিস্তান সরকার বেলুচদের কোনও কিছুই দিতে চায় না। আর বেলুচরাও এই সরকারের থেকে কিছু নিতেও চায় না।” 

তথ্যসূত্র : সিএনএন 

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত