১২ দিনেই ৭০ কোটি ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ২১:৪৭:০০
দাম ধরে রাখতে ডলার কিনেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবারও (১২ জানুয়ারি) নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১০ ব্যাংকের কাছ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) একই দরে ১৫ ব্যাংকের কাছ থেকে ২০ কোটি ৬০ লাখ ডলার কেনা হয়। দুই দিন আগে ৬ জানুয়ারি কেনা হয় ১৪ ব্যাংকের কাছ থেকে ২২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। নতুন বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি কেনা হয়েছিল ১৮ কাটি ৭৫ লাখ ডলার।
এ নিয়ে চলতি মাসের ১২ দিনে চার দফায় ৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কেনা হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।
৩০ ডিসেম্বর ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়। ২৮ ডিসেম্বর কেনা হয় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২১ ডিসেম্বর কেনা হয় ৬ কোটি ডলার। ১৭ ডিসেম্বর কেনা হয় ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ১৫ ডিসেম্বর কেনা হয়েছিল ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
১১ ডিসেম্বর ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। ৯ ডিসেম্বর কেনা হয় ২০ কোটি ২০ লাখ ডলার। ৩০ নভেম্বর কিনেছিল ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এর আগে ডলারের দর ‘স্থিতিশীল’ থাকায় দেড় মাস অবশ্য কোনো ডলার কেনেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে ডলারের দর আবার কমতে শুরু করায় ফের ডলার কেনা শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সব মিলয়ে গত ছয় পাঁচ মাসে (গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে নতুন বছরের ১২ জানুয়ারি) ৩৮৩ কোটি ৩৫ লাখ (৩.৮৩ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আর এই ডলার কেনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছয় মাসে ব্যাংকগুলোকে ৪৬ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা) দিয়েছে। এতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে।
ডলার কিনে বাজারে টাকা সরবরাহ করায় মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন।
মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফনে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে অর্থাৎ ডলারের দর যাতে কমে না যায় সেজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, বাজার স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। সোমবার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১০ ব্যাংকের কাছ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে।
আগের মতোই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ (এফএক্স) নিলাম কমিটির মাধ্যমে মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে এই ডলার কেনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আরিফ খান বলেন, “ডলারের দর বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, আবার কমে যাওয়াও ভালো নয়। তাই এ বাজারকে ‘সুস্থির’ রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামে ডলার কিনছে। তাতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে।”
বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম থেকে হঠাৎ করেই ডলারের দর কমতে শুরু করে; ১২১ টাকায় নেমে আসে।
ডলারের দাম কমে গেলে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়। সে কারণেই দাম ধরে রাখতে নিলামে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
১৩ জুলাই প্রথম ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যংক। ওইদিন ১৮টি ব্যাংক থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়। ১৫ জুলাই একই দরে ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২৩ জুলাই ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা দরে ১ কোটি ডলার কেনা হয়।
এর পর ৭ আগস্ট ১২১ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ১০ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ১৪ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ২৮ আগস্ট ১২১ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৭০ পয়সা দরে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২ সেপ্টেম্বর ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, ৪ সেপ্টেম্বর ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, ৯ সেপ্টেম্বর ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ১৫ সেপ্টেম্বর ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার, গত ২২ সেপ্টেম্বর ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ১২ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়।
৬ অক্টোবর ১২১ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৮০ পয়সা দরে ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার কেনা হয়। ৯ অক্টোবর কেনা হয় ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ১৩ অক্টোবর ৬ ব্যাংকের কাছ থেকে আরও ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর পর দেড় মাস অবশ্য কোনো ডলার কেনেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই মধ্যে ডলারের দর আবার কমতে শুরু করায় ফের ডলার কেনা শুরু হয়। ৩০ নভেম্বর ১২২ টাকা ২৫ পয়সা দরে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার কেনা হয়।
গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কয়েক দফায় ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বছরেও ডলার কেনা অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক; প্রথম মাস জানুয়ারির আট দিনে তিন দফায় কেনা হয়েছে ৬১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
আর এভাবেই সব মিলিয়ে ডলার কেনার অঙ্ক চার বিলিয়ন ডলার ছুঁইছুঁই করছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়; ৮৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১২২ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
ডলারের বাজারের অস্থিরতার আঁচ দেশে মুল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে দিয়েছিল।
টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে আমদানি বিল পরিশোধে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে ডলার বিক্রি করেছিল, সেখানে এখন চলছে উল্টো প্রবাহ।
গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছর পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করে, যা মূলত জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি বিল মেটাতে ব্যবহার হয়েছে।
আকুর বিল মিটিয়েও ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ
এদিকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনায় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সর উল্লম্ফনে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।
রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে।
গত ৭ জানুয়ারি রিজার্ভ বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ২৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
৮ জানুয়ারি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের ১৫৩ কোটি (১.৫৩ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট রিজার্ভ নেমেছে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই। অভ্যুত্থানের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও উদ্বেগ কাটছিল না।
তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় এবং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তার ঋণে রিজার্ভ স্বস্তির জায়গায় এসেছে।
নতুন বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।
২৪ ডিসেম্বর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগে গত বছরের ৮ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৬ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
৫ মাসের আমদানি ব্যয় মিটবে
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত অক্টোবর মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানের ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।
রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত, ১১ দিনে বেড়েছে ৮১%
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেও জোয়ার বইছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে। এই মাসের প্রথম ১১ দিনেই ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ (১.৩৪ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা।
এই অঙ্ক গত বছরের জানুয়ারির একই সময়ের চেয়ে ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারির এই ১১ দিনে ৭৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। পুরো মাসে পাঠিয়েছিলেন ২১৮ কোটি ৫২ লাখ (২.১৮ বিলিয়ন) ডলার।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থ বছরের ছয় মাস ১১ দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি) ১ হাজার ৭৬০ কোটি ১০ লাখ (১৭.৩৯ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থ বছরের এই ছয় মাস ১১ দিনে ১ হাজার ৪৫১ কোটি ৩০ লাখ (১৪.৫১ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।