Beta
Logo

সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রধান ঝুঁকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড : ডব্লিউইএফ

২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রধান ঝুঁকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড : ডব্লিউইএফ
আবদুর রহিম হারমাছি
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০৯:০০

নতুন বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ঝুঁকি হচ্ছে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা। আগের বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থানের মতো বিষয় প্রধান ঝুঁকি হিসেবে স্থান পেত। এবার নির্বাচনের বছর প্রথমবারের মতো ‘অপরাধ’ সেই জায়গা নিয়ে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) জেনেভা থেকে ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬’ শীর্ষক এই প্রতিবদনেটি প্রকাশ করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ঝুঁকি হবে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা।

 

প্রতিটি দেশের জন্য পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হবে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত, যেমন—নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই। গত কয়েক বছরে ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বা সংঘাত বাংলাদেশের প্রথম পাঁচ ঝুঁকির তালিকায় ছিল না।

 

তৃতীয় প্রধান ঝুঁকি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তত্যে দেখা যায়,  দেশে প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে; গড় মূল্যস্ফীতি এখন ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

 

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থনৈতিক ধীরগতিকে। বলা হয়েছে, মন্দা বা স্থবিরতার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। পঞ্চম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ঋণ—সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক।

 

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বেড়েছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

প্রতিবেদনে স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক ঝুঁকিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

প্রতিটি দেশের ঝুঁকি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকার নিয়েছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর ওপর জরিপ পরিচালনা করেছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

 

বার্ষিক সভা সামনে রেখে প্রতিবছর জানুয়ারিতে গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট বা বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডব্লিউইএফ। তাতে জরিপের ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের পাশাপাশি নিকট মেয়াদে দেশভিত্তিক ঝুঁকির তালিকা বিষয়গুলো তুলে ধরে সতর্ক করা হয়।

 

দেশভিত্তিক প্রধান ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করতে নির্বাহী মতামত জরিপ (ইওএস) চালায় ডব্লিউইএফ। এটি মূলত ধারণাভিত্তিক জরিপ। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আগামী দুই বছরে আপনার দেশের জন্য প্রধান পাঁচটি ঝুঁকি কী কী, যা দেশের জন্য বড় হুমকি?’

 

অংশগ্রহণকারীদের ৩৪টি ঝুঁকির তালিকা দেওয়া হয়। সেখান থেকে তারা পাঁচটি প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করেন। ডব্লিউইএফ গত বছরের মার্চ থেকে জুন সময়কালে ‘জাতীয় ঝুঁকি ধারণা’ জরিপ করে। বিভিন্ন খাতের প্রধান নির্বাহীরা এতে অংশ নেন।

 

ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাসহ দেশের ১০২টি কোম্পানির নির্বাহীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে জরিপ করা হয়েছে। সারা বিশ্বে একই প্রশ্নমালায় এই জরিপ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। সেখান থেকে তারা এই ঝুঁকির তালিকা করেছে।

 

২০২৫ সালের মে-জুলাই মাসে এই জরিপ করা হয়েছে। ৩৪টি বিষয়ের মধ্যে আগামী ২ বছরের জন্য ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল কোম্পানির নির্বাহীদের।

 

এ বিষয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “দেশের কোম্পানিগুলো যে তখন অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ওই সময় দেশে চাঁদাবাজি, লুটপাট, ছিনতাই—এসব অনেক বেড়ে গিয়েছিল।”

 

তবে তখনকতার তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জম। তিনি বলেন, “তখনকার তুলনায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমেছে, কিন্তু ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে এআইয়ের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে।”

 

নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ফলে অর্থনৈতিক ধীরগতি যে শঙ্কা ছিল, তা কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

 

বিশ্ব ব্যাংক বলেছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) হবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

 

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিযুক্ত বোধ করায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। উন্নত জীবনের আশা তাদের হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই ক্ষোভ ও বঞ্চনা থেকেই দেশে এই অভ্যুত্থান। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

 

বাংলাদেশে এবার ‘অপরাধ’ কেন এক নম্বর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হলো—জানতে চাইলে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বিশেষত, ‘মব ভায়োলেন্স’-এর প্রচুর ঘটনার কারণে আগামীর ঝুঁকি হিসেবে মানুষের চিন্তায় এসেছে। এটি নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি বড় বার্তা।”

 

‘অপরাধ’-এর সঙ্গে ‘অবৈধ বা বেআইনি অর্থনৈতিক কার্যক্রম’ যুক্ত হওয়ার কারণ কী হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমার ধারণা, সামাজিক অপরাধ বেড়ে গেলে তার প্রভাব অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পড়ে। সেই বিবেচনায় হয়তো জরিপে অংশগ্রহণকারীরা এটিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন।’

 

ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বলতে ডব্লিউইএফ নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি শুল্ক এবং বিনিয়োগ পর্যালোচনার মতো বিষয় বুঝিয়েছে।

 

এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী ভূরাজনীতির ভূমিকা অনেক বড়; যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ততা বৃদ্ধি যার অন্যতম কারণ।

 

“ভূ-অর্থনৈতিক বিরোধ বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষত রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

 

বাংলাদেশ ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে বড় প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়নে অনেক সময় ভূরাজনীতির প্রভাব থাকে। এ ধরনের বিষয়ে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য ভূরাজনৈতিক ইস্যু বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে।”

 

অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি একটু কমলেও তা এখন অনেক উচ্চ পর্যায়ে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যথেষ্ট ধীরগতি রয়েছে। ফলে জরিপে যেসব ঝুঁকির কথা এসেছে, সেগুলো আমলে নিয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

 

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ এসেছে। এক জায়গায় বলা হয়েছে, যেহেতু অনেক বেশি মানুষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে এবং জীবনমান উন্নতির আশা হারাচ্ছে, তাই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন– বাংলাদেশ ও নেপালে ২০২৪ সালে এবং শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে।

 

আগের বছরগুলোতে কোন কোন ঝুঁকি ছিল

 

‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৫’-এ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল মূল্যস্ফীতি। কেননা—এর আগের বছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল। অন্য চার ঝুঁকির মধ্যে ছিল যথাক্রমে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, পরিবেশদূষণ, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক নিম্নগতি।

 

২০২৪ সালের রিপোর্টে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ছিল নিকট মেয়াদে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বাকি চারটি ঝুঁকি ছিল– মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক নিম্নগতি, সম্পদ ও আয়বৈষম্য এবং সরকারের ঋণ ও নিম্ন কর্মসংস্থান।

 

২০২৩ সালের রিপোর্টে এক নম্বরে ছিল মূল্যস্ফীতি। অন্য চার ঝুঁকি ছিল– ঋণ সংকট, পণ্যমূল্যের গুরুতর অভিঘাত বা প্রভাব, মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় এবং সম্পদের ওপর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

 

২০২২ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের প্রধান ঝুঁকি ছিল কর্মসংস্থান ও জীবিকা। অন্য প্রধান ঝুঁকির মধ্যে ছিল ডিজিটাল বৈষম্য, কৌশলগত সম্পদের ভূরাজনীতি, মানুষের দ্বারা পরিবেশের ক্ষতিসাধন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সাইবার নিরাপত্তায় ব্যর্থতা।

 

বৈশ্বিক ঝুঁকি

 

বৈশ্বিক পরিসরে এবার অনেক বড় ঝুঁকির কথা বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। তারা মনে করছে, নতুন প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রেক্ষাপটে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ঝুঁকি। এরপরের চারটি ঝুঁকি হলো রাষ্ট্রীয় সংঘাত, চরম আবহাওয়া, সামাজিক মেরুকরণ আর ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি—উভয়ই বেড়েছে। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। স্বল্প মেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।

 

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা শক্তি হারাচ্ছে

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এখন ব্যাপক চাপের মুখে। পারস্পরিক আস্থা কমে যাচ্ছে—স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান সুরক্ষাবাদ।

 

এসব কারণে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে। বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি। সে কারণে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আরও