সোনার দামে নতুন রেকর্ড, ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার ছাড়াল
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ২৩:৪৪:০০
ইতিহাস গড়ল সোনার দর। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেশের বাজারে সোনার ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা ছাড়াল।
মঙ্গলবার থেকে সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) প্রতিভরি সোনা ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫ টাকায় বিক্রি হবে; বেড়েছে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই সোনার দাম এত উচ্চতায় উঠেনি।
অন্যান্য মানের সোনার দরও প্রায় একই হারে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।
গত কয়েক দিন ধরে বিশ্ববাজারের সঙ্গে তালমিলিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম ওঠানামা করছে; একদিন বাড়ছে তো, পরের দিন কমছে।
দুই দিন আগে শনিবার (১০ জানুয়ারি) ২২ ক্যারেট মানের সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানো হয়। রবি ও সোমবার (১১ ও ১২ জানুয়ারি) ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকায় বিক্রি হয়।
তার দুই দিন আগে ৮ জানুয়ারি ১ হাজার ৫০ টাকা কমানো হয়; ভরি নেমেছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৮০৬ টাকায়। শুক্র ও শনিবার (৯ ও ১০ জানুয়ারি) দেশে এই দরে বিক্রি হয় সোনার গহনা বা অলংকার।
তার আগে দুই দফায় এই মানের সোনার দাম ভরিতে ৫ হাজার ১৩২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। ৫ জানুয়ারি বাড়ানো হয় ২ হাজার ৯১৬ টাকা; ভরি উঠেছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকায়। তার একদিন আগে ৪ জানুয়ারি বাড়ানো হয়েছিল ২ হাজার ২১৬ টাকা; ভরি ওঠে ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪০ টাকায়।
তার আগে চার দিনে তিন দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৬ হাজার ৭০৭ টাকা কমনো হয়েছিল।
নতুন বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি এই মানের সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমায় বাজুস। ভরি নেমেছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৭২৪ টাকায়।
তার একদিন আগে গত বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর ২ হাজার ৭৪১ টাকা কমানো হয়; ভরি নামে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকায়। ২৯ ডিসেম্বর ২ হাজার ৫০৮ টাকা কমানো হয়; ভরি নেমেছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ টাকায়।
এ হিসাবেই চার দিনের ব্যবধানে তিন দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৬ হাজার ৭০৭ টাকা কমেছিল।
বিশ্ববাজারে রেকর্ড গড়ায় দেশের বাজারেও সোনার দরে নতুন রেকর্ড গড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।
লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত ৩০ ডিসেম্বর এই মানের সোনার দাম ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৩১ টাকায় উঠেছিল। যা ছিল এতদিন রেকর্ড; এর আগে কখনও দেশের বাজারে সোনার দর ওই উচ্চতায় উঠেনি।
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ ডিসেম্বর থেকে দেশের বাজারে সোনার দাম টানা বাড়ে। ১৬ দিনে সাত দফায় ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনার দাম ১৮ হাজার ৩৩৭ টাকা বাড়ে।
২৭ ডিসেম্বর এই মানের প্রতিভরি সোনার দাম ১ হাজার ৫৭৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল; আর তাতে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ভরি ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকায় উঠেছিল।
চার দিন আগে ২৩ ডিসেম্বর বাড়ানো হয় ৪ হাজার ২০০ টাকা; ভরি উঠেছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮২ টাকায়।
২১ ডিসেম্বর ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানো হয়; রেকর্ড গড়ে ভরি ওঠে ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৭ টাকায়। একদিন না যেতেই ২২ ডিসেম্বর সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ে সোনার দর। ভরি ওঠে ২ লাখ ২২ হাজার ৮২ টাকা; বাড়ানো হয় ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা।
আর এভাবেই রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছিল এই ধাতু।
২০ অক্টোবর প্রতিভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮২ টাকায় উঠেছিল; যা ছিল ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এরপর তা নিম্মমুখী হয়। চার দফায় সাড়ে ২৩ হাজার টাকা কমে ২৮ অক্টোবর ভরি ২ লাখ টাকর নিচে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮০৯ টাকায় নেমেছিল।
এর পর বিশ্ববাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম চড়তে থাকে। নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে চলে।
এর আগে ১৫ ডিসেম্বর সোনার দর বাড়িয়েছিল বাজুস। সেদিন ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৪৭০ টাকা বাড়ানো হয়; ভরি ওঠে ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭ টাকায়।
দুই দফায় সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) সোনার দাম ভরিতে ৩ হাজার ৯৭৮ টাকা বাড়ানোর পর গত ২ ডিসেম্বর ১ হাজার ৫০ টাকা কমানো হয়েছিল।
নয় দিন পর ১১ ডিসেম্বর এই মানের সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়ানা হয়: ভরি ওঠেছিল ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকায়। দুই দিন পর ১৩ ডিসেম্বর বাড়ানো হয় ৩ হাজার ৪৫২ টাকা; ভরি ওঠে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৭ টাকায়।
তার দুই দিন পর ১৫ ডিসেম্বর বাড়ানো হয় ১ হাজার ৪৭০ টাকা; ভরি ওঠে ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৭ টাকায়। ছয় দিন পর ২১ ডিসেম্বর বাড়ানো হয় ১ হাজার ৫০ টাকা; ভরি ওঠে ২ লাখ ১৮ হাজার ১১৭ টাকায়।
এ হিসাবে ১৬ দিনের ব্যবধানে সাত দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১৮ হাজার ৩৩৭ টাকা বেড়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। আগস্টের মাঝমাঝি সময় থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়া শুরু হয়। তার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারেও দাম বাড়িয়ে চলে বাজুস।
আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে অস্থির সোনার বাজার। গত সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১২ বার দাম সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ১০ বারই বাড়ানো হয়, কমে মাত্র দুইবার। ওই মাসে ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনার দাম বাড়ে ২১ হাজার ৬৬ টাকা।
সেই উল্লম্ফন মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত চলে। ওই মাসে টানা সাত দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ২১ হাজার ৯৯৭ টাকা বেড়েছিল।
২২ অক্টোবর থেকে নামতে থাকে সোনার দর। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত কমে। ২৯ অক্টোবর ফের বাড়ে। ৩০ অক্টোবর আবার কমানো হয়।
নভেম্বর মাসেও চড়া ছিল সোনার বাজার। সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও অব্যাহত থাকে। তবে একেবারে শেষ দিকে এসে নিম্মমুখী হয়।
নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১২দিনে সাত বার সোনার দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এর মধ্যে চার বার বেড়েছে; কমেছেও তিন বার।
বিদায়ী ২০২৫ সালে মোট ৯১ বার সোনার দাম সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে ৬৪ বার বেড়েছে, আর কমেছে ২৭ বার।
২০২৪ সালে দাম সমন্বয় হয়েছিল ৬২ বার।
গত ২০ আগস্ট থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম টানা বাড়ছিল। সেই দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজুসও দেশের বাজারে এই ধাতুর দাম বাড়িয়ে চলে। মাঝে নিম্মমুখী হওয়ায় দেশের বাজারেও কমানো হয়।
বাজুস সাধারণত রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে সোনার দাম বাড়ানো-কমানোর ঘোষণা দিয়ে থাকে। পরের দিন থেকে সারা দেশে সেই দরে সোনা বিক্রি হয়।
তবে মাঝে-মধ্যে দিনে দুই বারও সোনার দাম বাড়ানো-কমানোর ঘোষণা দিয়ে থাকে সংগঠনটি।
সেই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাত ৯টায় সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাজুস। আর এর ব্যাখ্যায় সংগঠনটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজুসের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে দেশের বাজারে হলমার্ক করা এক গ্রাম ২২ ক্যারেট মানের সোনা ১৯ হাজার ৮৯৫ টাকায় বিক্রি হবে। ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রামে এক ভরি হিসাবে প্রতিভরি বিক্রি হবে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৫ টাকায়। ২১ ক্যারেটের এক ভরি কিনতে লাগবে ২ লাখ ২১ হাজার ৪৯৯ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৯০ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৮১ টাকায় বিক্রি হবে।
রবি ও সোমবার—দুই দিন দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনা ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকায় বিক্রি হয়। ২১ ক্যারেটের বিক্রি হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৫৩৪ টাকায়।
১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৩ টাকায় বিক্রি হয়।
হিসাব বলছে, দুই দিনের ব্যবধানে প্রতিভরি ২২ ক্যারেটের সোনার দাম বাড়ছে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা। ২১ ক্যারেটেরও বাড়ছে ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটে ৩ হাজার ৪৪১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনার দাম বাড়ছে ১ হাজার ৪৫৮ টাকা।
বিশ্ববাজারেও রেকর্ড
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে গত ২৭ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে ৪ হাজার ৫৩৪ ডলার ১৬ সেন্টে উঠেছিল।
পরে অবশ্য তা নিম্মমুখী হয়; ৪ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। সেই দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারেও কমানো হয়। পরে ফের বেড়ে ৪ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়ায়; সোমবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৪ হাজার ৬০০ ডলারের মাইলফলক অত্রিকম কবরেছে।
সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স দাম ছিল ৫ হাজার ৬১৪ ডলার ৭ সেন্ট। বেড়েছে ১০৪ ডলার ৮৭ সেন্ট। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
১০ জানুয়ারি রাতে বাজুস যখন দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় তখন প্রতিআউন্সের দাম ছিল ৪ হাজার ৫০৯ ডলার ২ সেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পর সোনার দাম হু হু করে বাড়ছিল। ২২ এপ্রিল প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়ায়।
এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দর ৩ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে লেনদেন হয়। আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে ফের বাড়ছিল মূল্যবান এই ধাতুর দর।
এরপর ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন। নভেম্বরের শুরু থেকে বাড়তে থাকে। ১৪ নভেম্বর থেকে ফের নিম্নমুখী হয়। এর পর বাড়া-কমার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন।
তবে গত ১২ ডিসেম্বর থেকে টানা বেড়ে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে। ২৯ ডিসেম্বর থেকে ফের নিম্নমুখী হয়। এর পর ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন।
এখন আবার চড়ছে; গড়েছে নতুন রেকর্ড।