হঠাৎ একটি নীল স্কার্ট এতো শক্তিশালী হয়ে উঠল যে তার দাপটে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আর একটু হলেই সিংহাসনচ্যুত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়তেন। ১৯৯৭-এর নভেম্বরের একদিন একদা হোয়াইট হাউস ইনটার্ন মনিকা লিউনস্কি তার বিশ্বস্ত এবং প্রায় বন্ধুতুল্য লিন্ডা ট্রিপকে বললেন তার কাছে নিজের একটা নীল পোশাক আছে, গত ফেব্রুয়ারিতে সে যখন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে মৌখিক যৌনানন্দে অংশ গ্রহণ করেছিল তখন প্রেসিডেন্সিয়াল সিমেন ছিটকে তার এই পোশাকটিতে পড়েছিল এবং সে দাগ এখনো আছে।
লিন্ডা ট্রিপ তখনই তার লিটারেরি এজেন্ট লুসিয়ান গোল্ডবার্গকে ফোন করে খবরটা ছাপার জন্য বাজার দেখতে বললেন। লিন্ডা ট্রিপ ও লুসিয়ান গোল্ডবার্গ উভয়ে ক্লিনটন-হ্যাটার্স। মানুষের মধ্যে লাভ ও হেইট দুই’ই থাকে, কারও জন্য বরাদ্দ ভালোবাসা, কারও জন্য ঘৃণা। লিন্ডা ও লুসিয়ান ক্লিনটনকে অপছন্দ করেন এবং মনেপ্রাণে তার পতন কামনা করেন।
লিন্ডার আবিস্কৃত ব্রেকিং নিউজের সারাংশ হচ্ছে: ক্লিনটন ও মনিকা লিউনস্কির মধ্যেকার শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মনিকার কাপড়ের আলামারিতে রক্ষিত আছে।
টাইম ও নিউজউইকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় লিন্ডা ট্রিপ ও লুসিয়ান গোল্ডবার্গ স্কার্টটি হস্তগত করার জন্য চুরি করার মহাপরিকল্পনাও করেছিলেন।
নভেম্বরের শেষদিকে মনিকা তার শুভাকাঙ্খী লিন্ডাকে বললেন স্কার্টটি স্যুভেনির হিসেবেই তিনি রেখে দেবেন, তবে সামনের একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নীল স্কার্ট পরে যোগ দেবেন, সে জন্য এটাকে এখন লন্ড্রিতে পাঠিয়ে দেবেন।
কিন্তু এ কথা শুনে লিন্ডা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। প্রেসিডেন্টকে ঘায়েল করার জন্য ড্রেসটা যেমন আছে ঠিক তেমনই রাখতে হবে। মনিকাকে বললেন, তুমি আমার নিজের মেয়ে হলে বলতাম তোমার নিজের চূড়ান্ত সুরক্ষার জন্য এই ড্রেসটা যেমন আছে তেমন ভাবেই সঞ্চিত রাখতে হবে।
তারপর বললেন, কখনও হয়ত তোমার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠতে পারে তুমি প্রেসিডেন্টকে নিয়ে মিথ্যাচার করেছো, আর তোমার দাবি প্রমাণ করতে না পারলে ভয়ঙ্কর শাস্তি হবে। আর সেই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে এই নীল স্কার্ট তোমাকে রক্ষা করবে, এটাই হবে আলটিমেট প্রটেক্টর।
এসব আবার কখনও ঘটবে নাকি এ নিয়ে মনিকা যখন সন্দিহান, লিন্ডা বললেন, তাছাড়া এটা পরলে তোমাকে সত্যিই মোটা দেখায়। মানুষের সামনে এ পোশাকে তোমার যাওয়া ঠিক হবে না।
১৯৯৮-র জুলাইর শেষ দিকে মনিকা তার ড্রেসটা কেনেথ স্টার এর তদন্তকারীদের কাছে সমর্পন করল, তাদের সাথে একটি ইমমিউনিটি এগ্রিমেন্ট সই করতে হলো।
পরীক্ষার জন্য ৩ আগস্ট ১৯৯৮ ক্লিনটনের কাছ থেকে ব্লাড স্যাম্পল নেওয়া হলো এবং ১৭ আগস্ট এফবিআই সূত্র থেকে জানিয়ে দেওয়া হলো কাপড়ে লেগে থাকা শুক্রের দাগের উৎস স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন। আর এই পরীক্ষার যুক্তিসঙ্গত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।
যখন এই নিশ্চয়তার খবর সংবাদ মাধ্যম্যে প্রকাশিত হতে শুরু করল, বিরোধী রাজনীতিবিদ সমালোচক ও বিশ্লেষকগণ বলতে থাকলেন মনিকার সাথে যৌন সম্পর্কের যে অভিযোগ ক্লিনটন অস্বীকার করেছেন তা ডাহা মিথ্যে, এই নীল স্কার্টই তাদের মধ্যকার সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ।
এ কাহিনির বাকিটুকু সবার জানা। একবার শপথ নিয়ে মিথ্যে বলে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ইমপিচমেন্টের মুখে পড়লেন। তিনি ভাগ্যবান যে পদচ্যুত হননি। বিশেষ উদারতা দেখালেন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন। তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করলেন না।
দিন শেষে জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল তার। নারী ভোটার কমল না। সহানুভূতি ভোট যোগ হলো সাথে।
একাদশ কমান্ডমেন্ট: দাউ শ্যাল নট কমিট এডালটারি
কয়েক হাজার বছর আগে স্রষ্টা মোজেস-এর কাছে দৈব মাধ্যমে দশটি ঐশীবাণী পাঠিয়েছিলেন। এই টেন কমান্ডমেন্টস সবার কম-বেশি জানা। ‘একাদশ কমান্ডমেন্টে’র খসড়াও করাই ছিল। কিন্তু যথার্থতা পরীক্ষা না করে তো আর এ ধরনের ঐশীবাণী নাজেল করা যায় না। স্রষ্টাকে অপেক্ষা করতে হলো অনেকদিন। তাকেও সবুর করতে হয়। উপযুক্ত পাত্র না পেলে এমন গুরুত্বপূর্ণ দৈববাক্য বহনের ভার যেকোনও টম-ডিক-হ্যারিকে দিলেই তো হবে না— অনুপযুক্ত হলে জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার হয়ে যাবে।
দশটির একটি ‘দাউ শ্যাল নট কমিট এডালটারি’। সোজা কথায় ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না। আরও সহজ কথায় বিবাহিত জীবনসাথী ছাড়া অন্য কোনও রমণীতে আসক্ত হবে না। এটি ক্ল্যাসিকাল কমান্ডমেন্ট। বাণীটি ল্যাটিন ভাষার মতোই ব্যবহারিক জীবনে অচল হলেও এ নিয়ে গবেষণাধর্মী অনুসন্ধান চালানো যায়।
স্রষ্টার গণসংযোগ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ফোর্সেস ইন্টিলিজেন্স প্রধান বাংলাদেশের একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির নাম প্রস্তাব করেন। বিষয়টি নিয়ে ভালো করে ভেবেচিন্তে কথা বলার পরামর্শ দিলেন স্রষ্টা নিজেই। বললেন, অপেক্ষা করো। শেষটা দেখো। আমার প্রেরিত একজন ইংরেজ কবি ও নাট্যকারকে দিয়ে আর একটি বাক্য নাজেল করিয়েছি—‘সব ভালো তার শেষ ভালো যার’। তোমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ চলছে। ধাক্কাটা সামলাতে পারে কিনা দেখো। এ যাত্রা টিকে গেলে দেখা যাবে।
তিনি ধাক্কাটা সামলাতে পারলেন না। সুতরাং দাউ শ্যাল নট কমিড এডালটারি— এই বিশেষ কমান্ডমেন্ট বহাল থেকে গেল। সংশোধিত ঐশীবাণী আর নাজেল হলো না। স্রষ্টার ধৈর্যের শেষ নেই, শেষ থাকতে নেই। আরও বছর দশেক লেগে গেল, পছন্দের মানবপুত্রের জন্য। ‘মনিকাগেট কেলেঙ্কারি’র পর ইমপিচমেন্ট মোশনের ধাক্কাটা যখন ক্লিনটন কাটিয়ে উঠলেন অমনি স্রষ্টা ঠিক করলেন, আর দেরি নয় এবার বোধহয় পেয়ে গেছি। এই সেই ব্যক্তি। মর্ত্যধামে অমৃতের সন্তান। নারীঘটিত কেলেঙ্কারি ঝেড়ে ফেলে যিনি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন তিনি বহন করতে পারবেন এই ঐশীবাণীর ভার। প্রথমে স্রষ্টার নিজেরই দ্বিধা ছিল বাণীটি কি সপ্তম কমান্ডমেন্টের সংশোধনী হিসেবে নাজেল করাবেন না নতুন অর্থাৎ একাদশতম কমান্ডমেন্ট হিসেবে ছাড়বেন।
প্রথম অর্থাৎ আদি দশ কমান্ডমেন্ট ব্রাত্যজনের। ডন জোয়ান, রাসপুটিন প্রমুখ অসীম শক্তি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেনও; কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। যেমন পারেননি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেমিক প্রেসিডেন্ট।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো মূল কমান্ডেমেন্ট থাকবে। এক চাঁদনি রাতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসের মাথা বরাবর সাদা বাড়ির ছাদে হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের কাঁধে হাত রাখবেন উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন। বাইরেও অপেক্ষা করবেন হাজার হাজার জনতা। সিএনএন-এর ক্যামেরা ধরবেন টেড টার্নার স্বয়ং। এবিসি, সিবিসি, বিবিসি তো থাকবেই। ট্যাবলয়েড দ্য সান-এর তৃতীয় পাতায় হিলারির একটা ছবি দেওয়া যায় কিনা সেই ভাবনায় মশগুল থাকবেন অস্ট্রেলীয় কুবের রুপার্ট মারডক। আকাশ আলোকিত করে স্রষ্টার বিশেষ দূত এসে আসন নেবেন ক্লিনটনের ক্বলব্-এ। একাদশ কমান্ডমেন্ট উচ্চারিত হবে সেখান থেকেই।
হঠাৎ প্রলয় নিনাদে একটি বেল বাজাল।
তারপর দুনিয়াজোড়া লোডশেডিং।
অবিশ্বাস্য নিস্তব্ধতা চারদিকে।
এমন সময় শোনা গেল : দাউ শ্যাল নট কমিট এডালটারি আনলেস ইউ হ্যাভ সেভেন্টি পার্সেন্ট পাবলিক সাপোর্ট।
সত্তর ভাগ জনসমর্থন না থাকলে ব্যাভিচারে লিপ্ত হবে না। জলদগম্ভীর স্বর তিনবার একই কথা উচ্চারণ করল। তারপর ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল সকল গ্রিডে বিদ্যুৎ চলে এল। পৃথিবী একেবারে ফকফকা। প্রবল করতালির মধ্যে হিলারির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে জনতাকে সানন্দে বুড়ো আঙুল দেখাতে দেখাতে ক্লিনটন সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন। এই বুড়ো আঙুলের ভঙ্গি বাঙাল ধরনের নয়, এর মানে আমাকে সমর্থন করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
ক্লিনটন শপথ নিয়ে বলেছেন, সব বাজে কথা। আই ডিড নট হ্যাভ সেক্সুয়াল রিলেশনস উইথ দ্যাট লেডি। ঐ মহিলার সঙ্গে আমার কোনও শারীরিক সম্পর্ক নেই।
শপথ নিয়ে যে মহিলার কথা বলার কথা তার নাম মনিকা লিউনস্কি। মাত্র টিনএজ স্তর পার হওয়া একটি মেয়ে। হোয়াইট হাউসের শিক্ষানবিশ কর্মী। কিন্তু ক্লিনটন গবেষকদের সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে দ্যাট লেডি বলতে প্রেসিডেন্ট ফার্স্ট লেডি হিলারিকেই বুঝিয়েছেন। এটা বিশ্বাসযোগ্য। হিলারির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক একবারই হয়েছিল, অনেক বছর আগে। তার প্রমাণ চেলসির জন্ম।
ক্লিনটন তাই বলে মনিকাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন— তাও নয়। ১৭ আগস্ট ১৯৯৮ গ্র্যান্ড জুরির সামনে বলেছেন, কি নাম যেন মেয়েটির ওহ হ্যাঁ, মনিকা, ওর সঙ্গে আমার একটা ইমপ্রোপার রিলেশান গড়ে উঠেছিল। ওটা এমন কিছু নয়। পাওলা জোন্সের সঙ্গে তো এর চেয়ে বেশি হয়েছে, তাতে কি? তাছাড়া এমন তো নয় যে আমি জোর করে কিছু করেছি। মনিকা চোখ টিপে দিয়েছে। সৌজন্যবশত আমিও জবাব দিয়েছি। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তা আর প্রয়াত খোমেনি নন, কিংবা জীবিত খামেনিও নন যে চোখ টিপের জবাব দেবেন না বা ছড়ানো চুলের বালিকাকে বলবেন, যাও চুল বেঁধে বোরখা পড়ে এসো। পায়ের গোঁড়ালি দেখা যায় কেন?
ক্লিনটনকে গ্র্যান্ড জুরির সামনে গ্র্যান্ড ডকে রেখেই এবিসি নিউজ, সিবিএস, ইউএসএ টুডে, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন এবং গেলাপ পোলসহ বিভিন্ন জরিপকারী রাস্তায় নেমে গেল। পরিসংখ্যানের সব রকম কায়দাকানুন প্রয়োগ করা হলো। স্থানে স্থানে দৈবচয়ন করা হলো। উপাসনালয় থেকে শুরু করে পতিতালয় কিছুই বাদ গেল না। মুণ্ডিতমস্তক তরুণী থেকে শুরু করে খোঁপাবাঁধা পুরুষ কাউকে উপেক্ষা করা হলো না।
সব সংস্থার একই ধরনের প্রশ্ন : এ ধরনের যৌন কলঙ্ক করেও কি ক্লিনটনের সিংহাসন দখলে রাখা উচিত? আসলে ক্লিনটন একজন যৌন উৎপীড়ক— কি বলেন? আমেরিকানদের জন্য ব্যাপারটা খুবই লজ্জার, তাই না? মনিকা যখন মামলা করার জন্য আদালতে ছুটে যায়নি, বিলকে উৎপীড়ক বলা কি ঠিক? যা হওয়ার হয়ে গেছে, চলুন চেপে যাই।
সব জরিপ জড়ো করে গড় বের করে দেখা গেল শতকরা ৭২ ভাগ আমেরিকান চাইছে ক্লিনটন থাকুক। অর্থাৎ স্রষ্টার হিসেবের দুভাগ বেশি। স্রষ্টা সন্তুষ্ট না হয়ে পারেননি। কাঁটায় কাঁটায় ৭০ হলেই মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
অতঃপর ক্লিনটন জনস্বার্থে দায়িত্ব নিয়েছেন, ৭০ শতাংশ বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, ৫১ শতাংশ মানুষের অনুমোদন থাকলেই ব্যভিচার করা যাবে। তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে বোঝাবেন, আমেরিকার মতো দেশে মানুষের শারীরিক আকাঙ্খা কমে গেছে। ভাব জাগে না। এইডস আতঙ্ক থেকে পুরুষের নিস্পৃহতা আরও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় জনসমর্থনের সিলিং নামানো না হলে, একাদশ কমান্ডমেন্ট একেবারে মাঠে মারা যাবে।
পাদটীকা: পৃথিবীর সব দেশের জন্য ৫১ শতাংশ অনুমোদিত হলো। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় তা ৭০ থেকে বাড়িয়ে ৯৯ শতাংশে উত্তীর্ণ করায় ক্লিনটন ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, এটা অবিচার। ৯৯ শতাংশ কখনও ভোট দিতেও আসে না। স্রষ্টা হেসে উঠলেন, বাংলাদেশ কয়েকটা ট্রায়াল ইলেকশন করেছে, ইলেকশন কমিশন বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। আমার আস্থা আছে ভোট যেভাবেই হোক, ওরা ৯৯ পার্সেন্ট সমর্থন ডিক্লেয়ার করতে পারবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
ইমেইল: momen98765@gmail.com