Beta
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
Beta
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

নতুন মিশনে নাহিদ

পদত্যাগের পর সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম।
পদত্যাগের পর সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম।
[publishpress_authors_box]

এক বছর আগে এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির বাইরে কে চিনত নাহিদ ইসলামকে; অথচ ছয় মাসের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন অতি চেনা মুখ। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচিত এই তরুণ, টাইম ম্যাগাজিনের শিরোনামেও আসে তার নাম।  

অভ্যুত্থানের নায়ক থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন নাহিদ; এখন নতুন দায়িত্ব নিতে সেই দায়িত্বও ছাড়লেন তিনি। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা যে নতুন দল গঠন করতে যাচ্ছেন, তাতে নেতৃত্বের ভূমিকায় তাকেই চাইছেন সহযোদ্ধারা।

সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ। তারপর সাংবাদিকদের সামনে এসে বলেন, এখন সরকারে থাকার চেয়ে রাজপথে থাকাই বেশি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং এই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউর সমাবেশে।

সেই দলের নাম এখনও ঘোষণা না হলেও নাহিদ যে তার প্রধান হচ্ছেন, তা এরই মধ্যে তার সহযোদ্ধারা নিশ্চিত করেছেন। নাহিদও এর আগে বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পদত্যাগ করবেন।

মঙ্গলবার তার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার খবর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “আশা করা যাচ্ছে, তিনি এই মাসের শেষের দিকে শুরু হতে যাওয়া একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব দেবেন।” তবে এখনই সব কিছু খোলাসা করতে চাননি নাহিদ; সবাইকে অপেক্ষায় রেখেছেন ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সময় ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয় নাহিদ ইসলামের ওপর।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে নাহিদের রাজনৈতিক সংযোগের কোনও খবর পাওয়া যায় না। ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে পরিবারের সঙ্গে থেকে স্কুল-কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরের বছর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। সেই আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিলেন নুরুল হক নুর। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের ব্যানারে সেই আন্দোলনের পর তারা ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে প্যানেল দেয়।

নুর ও রাশেদ খানের নেতৃত্বাধীন সেই প্যানেল থেকে সংস্কৃতি সম্পাদক পদে লড়েছিলেন নাহিদ। তিনি জিততে না পারলেও সেই প্যানেল থেকে ভিপি পদে নুর এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে আখতার হোসেন জয়ের পতাকা উড়িয়েছিলেন।

নুর পরে গণঅধিকার পরিষদ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতির মাঠে থেকে যান। এদিকে নুরের সঙ্গ ছেড়ে আখতার নতুন একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন, নাম দেন গণতািন্ত্রক ছাত্র শক্তি। সেই সংগঠনে আখতার হন আহ্বায়ক, নাহিদ নেন সদস্য সচিবের পদ।

এখন নতুন যে রাজনৈতিক দল হতে যাচ্ছে, সেখানেও তারা দুজনই শীর্ষ পদ দুটিতে বসছেন বলেই জানা যাচ্ছে। তবে পদ যাচ্ছে উল্টে; নাহিদ হচ্ছেন আহ্বায়ক, আর তার রাজনৈতিক গুরু আখতার হচ্ছেন সদস্য সচিব।

নাহিদের কয়েক বছরের সিনিয়র আখতার ও মাহফুজ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে সহপাঠি ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে পেছনে থেকে কাজ করে যাওয়া মাহফুজ এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা।

২০১৮ সালের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি চাকরিতে সব কোটা বাতিল করেছিল। তা নিয়ে একটি রিট আবেদন হলে ২০২৪ সালের জুন মাসে হাই কোর্ট সব কোটা পুনর্বহালের আদেশ দিলে শিক্ষার্থীরা আবার ফুঁসে ওঠে।

নুর-আখতাররা ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ায় নতুন আন্দোলনে হাল ধরেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র নাহিদ। আন্দোলন এগিয়ে নিতে গঠিত হয় নতুন নামে প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’।

সেই প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক হিসাবে গণমাধ্যমের সামনে আসতে শুরু করেন নাহিদ, পরিবারে যার নাম ফাহিম। এভাবে আসতে আসতে সবাই চিনতে শুরু করে নাহিদকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে, নাহিদ ইসলম তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারীর ভূমিকায়।

জুলাই মাসের শুরুতে রাজপথের আন্দোলনে নামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাতে নাহিদের ব্যস্ততাও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আন্দোলনে সমন্বয়ক হিসাবে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। তাদের একজন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসাবে যোগ দেন। নাহিদ পদত্যাগ করলেও মাহফুজ ও আসিফ আপাতত সরকারে থেকে যাচ্ছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি শুরুতে অহিংসই ছিল। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা পরিস্থিতি সহিংস করে তোলে।

তারপর দুই সপ্তাহে অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশ। আন্দোলন দমন শেখ হাসিনার সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যে রাজপথ ছাড়ার অনমনীয় ভূমিকা নেয় ছাত্ররা। নির্বিচারে গুলি, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, কারফিউ জারি, ইন্টারনেট বন্ধ নানা ঘটনায় সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

এক পর্যায়ে নাহিদকে ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে হাসপাতাল থেকে তিনিসহ ছয়জন সমন্বয়ককে ধরে নেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে; সেখানে নাহিদকে দিয়ে জোর করে পড়ানো হয় আন্দোলন স্থগিতের বিবৃতি। কিন্তু বাইরে তখন পরিস্থিতি ভিন্ন; আন্দোলন থেকে সরেনি কেউ।

চাপে পড়ে নাহিদদের মুক্তি দেয় সরকার। তারপর আন্দোলন চলতে থাকে। হাজারো মানুষের রক্তস্নাত সেই আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে এক দফার ঘোষণা আসে আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে। আন্দোলনের তোড়ে উড়ে যায় সরকার। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে।

তার তিন দিন পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলে উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নেন নাহিদ ও আসিফ; পরে এই তালিকায় যোগ হয় মাহফুজের নাম।

সেই শপথের ২০১ দিন পর মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেই ইস্তফাপত্র দেন নাহিদ। ইস্তফা দেওয়ার সময় নাহিদকে জড়িয়ে ধরা ইউনূসের ছবি শেয়ার করেছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আলিঙ্গনে নাহিদ ইসলাম।
পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আলিঙ্গনে নাহিদ ইসলাম।

উপদেষ্টা হিসাবে তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছিলেন নাহিদ।

পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি।

গত সাড়ে ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাহিদ বলেন, “সরকার কাজ করছে। হয়ত আমরা আশানুরূপ ফলাফল এখনও পাইনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, সরকারে একটা স্ট্যাবিলিটি এসেছে।”

সরকারে থেকে নিজের কাজ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি কাজ করে যাওয়ার। দুৃইটি মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অনেক অতিরিক্ত দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়েছে। সেই কাজের ফলাফল হয়তো সামনে জনগণ পাবে।”

“ছয় মাস খুবই কম সময়, তারপরও চেষ্টা করেছি। সেই কাজ জনগণ মূল্যায়ন করবে,” মূল্যায়নের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিলেন অভ্যুত্থানের এই ছাত্র নেতা।

তখন উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে নাহিদ বলেন, “তখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যৌক্তিক।”

নাহিদ আগে থেকেই বলে আসছিলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রথাগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়। অভ্যুত্থানের এই সরকারের কাজ শুধু নির্বাচন করা নয়।

অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরই নির্বাচন দেওয়া হবে বলে জানানো হচ্ছে। অন্যদিকে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেয়।

নতুন দল গঠনের এই উদ্যোগ বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনার মধ্যে পড়ে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাফ জানিয়ে দেন, ক্ষমতায় থেকে দল গঠন তারা মেনে নেবেন না। তখন নাহিদ বলেছিলেন, পরিস্থিতি তেমন হলে উপদেষ্টার পদ ছেড়েই তিনি রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন।

সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতেই এখন নাহিদের উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়া, তা স্পষ্ট।

তিনি বলেছেন, “আমি মনে করেছি, সরকারে থাকার চেয়ে রাজপথে থাকা বেশি প্রয়োজন, তাই পদত্যাগ করেছি।

“ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সরকারের বাইরে দেশের যে পরিস্থিতি, সেই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক শক্তি উত্থানের জন্য আমার রাজপথে থাকা প্রয়োজন। ছাত্র-জনতার কাতারে থাকা প্রয়োজন।”

মো. নাহিদ ইসলাম
উপদেষ্টা হিসাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি নাহিদ ইসলাম।

নতুন যে রাজনৈতিক দল গঠন হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণের ‘অভিপ্রায়’ রয়েছে জানালেও এ বিষয়ে আরও কিছু বলতে এখনই রাজি হননি নাহিদ।

তিনি শুধু বলেন, “আমরা যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা করি, সে আকাঙ্ক্ষার জন্য এবং গণঅভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-জনতা অংশগণ করেছে সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করছি, সরকারের থেকে সরকারের বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে।

“বাইরে যে আমাদের সহযোগী যোদ্ধা রয়েছে তারাও এটি চান। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকে মূলত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছে।”

দুই বছর আগে নাহিদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন, তখন তার অভিসন্দর্ভের বিষয় ছিল ‘কেন বাংলাদেশের কোনও ছাত্র আন্দোলন তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি?”

নিজে যে বিশ্লেষণ করেছিলেন, তার অভিজ্ঞতা হয়ত কাজে লেগেছে ২৬ বছর বয়সী নাহিদের। তার ফল হয়ে এসেছে অভ্যুত্থানের বিজয়গাথা, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে।

জুলাইয়ে যখন আন্দোলনে নেমেছিলেন, তখনও নাহিদ ভাবতে পারেননি যে তারা দেড় দশক ধরে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাৎ করতে পারবেন।

টাইম ম্যাগাজিনকে একথা বলেছিলেন তিনি। টাইমের সেই প্রতিবেদক কথা বলেছিলেন নাহিদের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফার সঙ্গে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে নাহিদ যখন শপথ নিচ্ছিলেন, তখন তার ‘অস্বাভাবিক রকম নার্ভাসনেস’ ধরা পড়েছিল সামিনা লুৎফা চোখে।

তার ভাষায়, “ও খুব ছোট, কিন্তু তার দায়িত্বটি ছিল বিশাল।”

সেই বিশাল দায়িত্ব সামলে এখন নতুন এক দায়িত্বের পথে নাহিদ, যখন বয়স তার মোটে ২৬ বছর।

লক্ষ্য কী-সেটা টাইমকে বলেছিলেন নাহিদ- “আর কোনও দুর্নীতি ও সহিংসতা জনগণ চায় না। আমাদের নতুন প্রজন্মের কথা বোঝা উচিৎ যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত