Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

খেলাপি ঋণ এক বছরে বেড়েছে ২ লাখ কোটি টাকা

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
[publishpress_authors_box]

বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে প্রধান সমস্যা যে খেলাপি ঋণ, তা কমার তো লক্ষণ নেই, বরং বেড়েই চলছে।

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। ছয় মাসে বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। তিন মাসের হিসাব করলেও বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিজেই এই তথ্য দিয়েছেন।

তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা গত সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এই পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসাবে বিতরণ করেছে।

এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এ হিসাবেই মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে দুই লাখ কোটি টাকা বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে আহসান মনসুর বলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, খেলাপি ঋণ বাড়বে। তবে এখনও খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”

খেলাপি ঋণের ঘানি টানতে হলেও ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা পেতে কোনও সমস্যা হবে না বলেও আশ্বস্ত করছেন গভর্নর।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা গত সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকেই শ্রেণিকৃত ঋণ বা খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

ডিসেম্বর শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে।

গত ডিসেম্বর শেষে সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার আগের প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই হার ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর পর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে।

অর্থনীতিবিদেরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট ্আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করেছে।

তাতে দেখা যাচ্ছে, সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি।

সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সমালোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়া ব্যাংকগুলো ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে।

একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেশ বেড়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলমসহ আরও কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। এতেও বেড়েছে খেলাপি ঋণ।

গভর্নর আহসান মনসুর বলেন, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা হয়েছে। যে কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সরকার পতনের আগেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে গত বছরের মার্চ থেকে কৌশলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ কমে এসেছে।

আবার তদারকি শিথিলতার কারণে এতদিন জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ আর ফেরত আসছে না। সরকার পতনের পর এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ঘরনার ব্যবসায়ীদের অনেকেই পালিয়েছেন। এতে করে খেলাপি ঋণ আগামীতে আরও বাড়তে পারে বলে ব্যাংকারদের আশঙ্কা।

যেভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ

কোভিড মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে কোনও ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত ছিলেন গ্রাহকেরা। ২০২২ সালে এসব নীতি ছাড় তুলে দেওয়ার পর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

এ অবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের জুনে ব্যাংকঋণ পরিশোধে আবার ছাড় দেয়। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী জুন মাসের মধ্যে ঋণের কিস্তির অর্ধেক টাকা জমা দিলেই একজন গ্রাহককে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে যেসব ঋণ গ্রাহক খেলাপি হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছিলেন, তারা অর্ধেক টাকা জমা দিয়েই নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে থাকার সুযোগ পান। এই সুবিধা দেওয়া হয় শুধু মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকেই মেয়াদি ঋণ।

এত সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি কেবল বাড়ছেই; বরং বারবার ছাড় দেওয়ার কারণে ভালো গ্রাহকেরাও ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মনে করেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, এতে ব্যাংকগুলো তারল্যসংকটে পড়ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে।

এদিকে গত বছর জাতীয় সংসদে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হয়। এর ফলে খেলাপিরাও ঋণ নেওয়ার সুযোগ পায়। আগে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। নতুন এই আইনের কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রকৃত খেলাপি ঋণ ‘৫ লাখ কোটি’ টাকা

বিশাল অঙ্কের এই ঋণ খেলাপি নিয়ে সবচেয়ে জোরালো কথা বলেন প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আজ ব্যাংকিং খাতের যে দুরবস্থা তার জন্য খেলাপি ঋণ দায়ী: বড় বড় ঋণ খেলাপিরা দায়ী। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাংকিং খাতে কখনই সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে না।”

খেলাপি ঋণের বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবও প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না জানিয়ে অধ্যাপক মইনুল বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক এখনও খেলাপি ঋণের যে হিসাব দিচ্ছে, তা প্রকৃত তথ্য নয়। কারণ, প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও অনেক বেশি।

“মামলার কারণে অনেক ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। আবার অবলোপন (রাইট অফ) করা ঋণও খেলাপির হিসাবে নেই। এ দুই ঋণকে বিবেচনায় নিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।”

খেলাপি ঋণ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ চেয়ে তিনি বলেন, “যত দিন ঋণখেলাপিদের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করে আলাদাভাবে বিচারের ব্যবস্থা করা যাবে না, তত দিন খেলাপি ঋণও কমবে না।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল বলেন, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে সাবেক দুই প্রধান বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন আহমদ ও মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ঋণখেলাপিদের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলেছিলেন।

“কিন্তু কোনও সরকারই এ উদ্যোগ নেয়নি। খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঘোড়াকে থামাতে হলে ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দের পাশাপাশি তাদের জেলের ভাত খাওয়াতে হবে। তাহলে হয়ত এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত