ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে হোঁচট
শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ২২:২৫:০০
ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে চীনকে প্রায় ধরে ফেলেছিল বাংলাদেশ। গত বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ৮০৭ কোটি (৮.০৭ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি।
ওই চার মাসে চীন ইউরোপের বাজারে ৮৩৮ কোটি (৮.৩৮ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।
কিন্তু ছয় মাস পরে এসে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন ইউরোপের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে; ব্যবধান প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন (৬০০ কোটি) ডলারের কাছাকাছি হয়ে গেছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এটা হয়েছে ট্রাম্প শুল্কের কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক রপ্তানি বাণিজ্যের গতিধারা পাল্টে দিচ্ছে। উচ্চ শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ক্রমেই ইউরোপমুখী হয়ে উঠছে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ চীন। দেশটি সুদূর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাক রপ্তানি বাড়াচ্ছে। এর প্রভাবে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হোঁচট খেয়েছে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীন প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। তাদের রয়েছে নিজস্ব কাঁচামাল, লিড টাইমের সুবিধা। লিড টাইম হচ্ছে রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সময়। বেশি উৎপাদনশীলতার সুবিধায় রপ্তানি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে চীন।
ইউরোপের বাজারে চীনের রপ্তানি বাড়ার বিষয়টিকে উদ্বেগের বলছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। তারা মনে করেন, ইইউ জোটে আগামীতে চীনের রপ্তানি আরও বাড়তে পারে, বিপরীতে কমতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, একক মাসের হিসেবে গত জুলাইয়ে ইউরোপের বাজারে ১৬৭ কোটি ৫০ লাখ (১.৬৭ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১৫৬ কোটি ৪৭ লাখ (১.৫৬ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ।
অন্য দিকে জুলাই মাসে চীন ইউরোপে ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ (২.৭৮ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২২ কোটি ২৭ লাখ (২.২২ বিলিয়ন) ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপের বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে চমক দেখিয়ে চলছিল বাংলাদেশ। নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে বড় বড় বাজারে রপ্তানি বাড়ায় খুবই খুশি ছিলেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা।
২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে।
পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা বন্ধসহ নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেশ কমে গিয়েছিল। ওই বছরের নয় মাস (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ২ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ নেতিবাচক (ঋণাত্মক) প্রবৃদ্ধি ছিল।
অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ইউরাপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা ২০২৩ সালের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ কম আয় করেছিলেন। আর তাতে রপ্তানিকারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল।
তবে ওই বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রপ্তানি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। ২০২৪ সালে ইউরোপের দেশগুলোতে মোট ১ হাজার ৯৭৭ কোটি ১২ লাখ (১৯.৭৭ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
আগের বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৮৮৫ কোটি ৫৭ লাখ (১৮.৮৫ বিলিয়ন) ডলার।
২০২৫ সাল শুরু হয়েছে বড় চমক নিয়ে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের পোশাক শিল্পমালিকরা ৩৬৯ কোটি ৩৩ লাখ (৩.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেন। ওই অঙ্ক ছিল আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭ দশমিক শতাংশ বেশি।
এর আগে দুই মাসে কখনোই এত প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি এই বাজারে। প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের এই প্রবৃদ্ধির ধারেকাছেও ছিল না।
২০২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে এই বাজারে ২৬৯ কোটি ৫৮ লাখ (২.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
ইইউতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। চীন সবার শীর্ষে। তৃতীয় তুরস্ক। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইউরোপের বাজারে চীনের রপ্তানি বেড়েছিল ২৫ শতাংশ। তবে গত বছরের সাত মাসের (জানুয়ারি-জুলাই) হিসাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমে যায়। অন্যদিকে চীনের বাড়ে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ১ হাজার ১৯৮ কোটি ৬৩ লাখ (১১.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের এই সাত মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার।
দশ মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে সেই প্রবৃদ্ধি কমে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেম এসেছে। এই দশ মাসে ইউরোপে বাংলাদেশ ১ হাজার ৮০৫ কোটি ৮৩ লাখ (১১.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে এই দশ মাসে চীন ইউরোপে ২ হাজার ৪৪২ কোটি ৩৩ লাখ (২৪.৪২ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ২২ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার।
সবশেষ নভেম্বরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই মাসে ১ হাজার ৩৭০ কোটি ছয় লাখ ডলারের (১.৩৭ বিলিয়ন) পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে নভম্বরে চীন ইউরোপে ২১৫ কোটি ৩ লাখ (২.১৫ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; কমেছে দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ২ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।
পরিমাণের দিক দিয়ে ইউরোপে চীনের চেয়ে বাংলাদেশের বেশি পোশাক রপ্তানি হলেও টাকার অঙ্কে (ডলার) সব সময়ই চীন শীর্ষে ছিল। তবে একবার নিট পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকে গিয়েছিল বাংলাদেশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে ১৩৩ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল। চীনের রপ্তানি ছিল ১৩১ কোটি কেজি।
আর ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউভুক্ত দেশগুলো ৯০০ কোটি (৯ বিলিয়ন) ডলারের নিট পোশাক নিয়েছিল। একই সময়ে চীন থেকে তারা ৮৯৬ কোটি (৮.৯৬ বিলিয়ন) ডলারের নিট পোশাক আমদানি করে।
ওই বছরের নয় মাসের হিসাবে প্রথমবারের মতো ইইউতে বাংলাদেশের নিট পোশাক রপ্তানি চীনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দাম ও পরিমাণ-উভয় ক্ষেত্রেই ওই নয় মাসে ইইউতে শীর্ষ নিট পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ছিল বাংলাদেশ।
ইইউতে পোশাক রপ্তানি কার কত
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম দশ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) ইইউর কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে ৮ হাজার ২৯৪ কোটি ৩৭ লাখ (৮২.৯৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি।
ইইউতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। চীন সবার শীর্ষে। তৃতীয় তুরস্ক; তবে তুরস্কের পরিমাণ বাংলাদেশের অর্ধেকেরও কম।
বাংলাদেশ, চীন ছাড়া অন্য দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক গত বছরের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে ইউরোপের বাজারে ৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; যা আগের বছেরর একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। ২০২৪ সালের দশ মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৮ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে ভারত ইউরোপের বাজারে ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে তাদের রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৩ দশমিক ৯২ বিলিযন ডলার।
কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি, ১৫ দশমিক ২১ শতাংশ। এই দশ মাসে দেশটি ইউরোপে ৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে তাদের রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১ দশমিক ৬০ বিলিযন ডলার।
অন্য দেশগুলোর মধ্যে জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ; রপ্তানি হয়েছে ৪ দশমিক শূন্য এক বিলিয়ন ডলারের পোশাক।
পাকিস্তানের রপ্তানির অঙ্ক ৩ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার; প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
এছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে ইউরোপের বাজারে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং মরক্কোর কমেছে দশমিক ১৮ শতাংশ।
২০২৪ সালে ইউরোপের কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে ৯২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছিল, যা ছিল ২০২৩ সালের চেয়ে ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি।
২০২৪ সালে চীন ইউরোপের বাজারে ২৬ দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল; যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি।
তবে ওই বছরে ইউরোপে তুরস্কের রপ্তানি বেশ খানিকটা কমেছিল; ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার কমেছিল ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।
ভারতের বেড়েছিল প্রায় ২ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছিল ২০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্য দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের বেড়েছিল ৪ দশমিক ২১ শতাংশ। পাকিস্তানের বেড়েছিল ১২ দশমিক ৪১ শতাংশ। মরক্কোর প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
উদ্বিগ্ন রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা
গত বছরের ২ এপ্রিল বাংলাদেশহ ৬৫ দেশের পণ্যে অতিরিক্ত বিভিন্ন হারে ‘পাল্টা শুল্ক’ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। দফায় দফায় ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের কথাও শোনা যায়। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন ইউরোপমুখী হবে বলে আশঙ্কার কথা বলে আসছিলেন অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশ্লেষক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা।
তাদের মতে, চীন ও ভিয়েতামের পণ্য আমদানিতে অস্বাভাবিক শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশ দুটির পণ্য রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে চীনা পণ্য রপ্তানি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এতে বাধ্য হয়ে অন্য বাজারগুলোতে চীনা পণ্য অন্যান্য দেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকার পরিস্থিতিতে দর কমানোর চাপ দেওয়ার সুযোগ নেবে ইইউর বাজারের ব্র্যান্ড-ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ রকম প্রবণতায় সাধারণত রপ্তানি কমে যায়।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের কথা শোনা গেছে। পরে সেটা কমে হয়তো ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়েছে। ঠিক কত শুল্কহার ঠিক করা হয়েছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা কাটেনি। তবে শুল্ক যতই হোক, তা বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে দ্বিগুণ বা কয়েক গুণ।
তিনি বলেন, “এত বেশি শুল্ক এড়াতে খুব স্বাভাবিক কারণেই চীন জোট হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার ইইউতে হিস্যা বাড়াতে চায়। তার সুফলই পাচ্ছে তারা। নিজস্ব কাঁচামাল, কম লিড টাইম, বেশি উৎপাদনশীলতায় তারা তো আগে থেকেই আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।
“আমাদের এখন উচিত শুল্কমুক্ত সুবিধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বাজার ইইউতে মনোযোগ আরও বাড়ানো।”
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খাচ্ছে।”
“এ ছাড়া ভারত ও চীনসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ওই বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না, তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে তারা মূল্য কমিয়ে দিয়ে পোশাক রপ্তানির অর্ডার নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা একই ধরনের পণ্যের অর্ডার নিতে পারছেন না। ফলে ইউরোপীয় বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।”
“তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—তারা কীভাবে পারছে? এর কারণ হলো—ভারত সরকার মার্কিন শুল্কজনিত ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে তাদের ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে। কিছুদিন আগেও তারা এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে; ৭ হাজার কোটি রুপির আরও একটি প্যাকেজ সহায়তা অনুমোদন দিয়েছে।”
“অন্যদিকে, আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রপ্তানি খাতের নগদ সহায়তাসহ নানা সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যে সামান্য সহায়তা অবশিষ্ট ছিল, তার মেয়াদও ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। সেটি নবায়নের জন্য আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি, যা রপ্তানিকারকদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে।”
“অন্যথায় রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের স্পিনিং মিল গুলো, একটার পর একটা গার্মেন্টস বন্ধ হচ্ছে, যা রপ্তানি খাতের জন্য অসনি সংকেত।”
“এ ছাড়া সাধারণত যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের আগে আমাদের রপ্তানি আদেশ কিছুটা কমে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে নির্বাচনের পর সরকার যদি শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আগামী জুনের পর থেকে রপ্তানি আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে,” বলেন মোহাম্মদ হাতেম।
একই কথা বলেছেন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকা ও ইউরোপ। ওই দুই জায়গাতেই রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প শুল্কের কারণে আমেরিকার বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এখন তারা তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য কম কিনছে। তার একটা প্রভাব পড়েছে আমাদের রপ্তানিতে।”
“অন্যদিকে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্ধি চীন ও ভারত আমেরিকার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপের বাজারে আগের চেয়ে বেশি বেশি পণ্য রপ্তানি করছে। অনেকে ক্ষেত্রে কম দামেও পোশাক রপ্তানি করছে তারা। সে কারণে ইউরোপের বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।
অর্থনীতির গবেষক বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির প্রধান দুই সূচক রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সংকট কেটে যাওয়ার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু রপ্তানি আয় কমায় সেটা হোঁচট খেয়েছে।”
“রপ্তানি আয় যাতে না কমে, সেদিকে এখন সরকার ও রপ্তানিকারকদের নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এভাবে রপ্তানি আয় কমলে রিজার্ভেও কিন্তু টান পড়বে। শুধু রেমিটেন্স দিয়ে রিজার্ভের পতন ঠেকানো যাবে না।”