Beta
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
Beta
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

কী হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সরে যায় আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংক থেকে

word-bank-imf-logo
[publishpress_authors_box]

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ফেরার পর কত কাণ্ডই না ঘটছে। গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে পড়ার ঘোষণা দেন তিনি, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও দেশকে নেন সরিয়ে। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইউএসএআইডির কার্যক্রমও দেন বন্ধ করে।

এবার কি তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে েনবেন. আলোচনা এখন তা নিয়ে।

বিশেষ করে জি-২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অনুপস্থিতি এই গুঞ্জনকেই ভিত্তি দিচ্ছে, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি করছে অস্বস্তি।

বর্তমানে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্র একটি সদস্য দেশ; এই একটি দেশের নিজেকে সরিয়ে নেওয়া কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের কাজ কী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় শেষ তখন বিজয়ী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে গড়ে তুলেছিল এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

যুদ্ধবিক্ষত বিশ্বের অর্থনীতিতে পুনরায় দাঁড় করানোর লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস এলাকার মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে ৪৪টি দেশের ৭ শতাধিক প্রতিনিধি জড়ো হয়েছিলেন এক সম্মেলনে।

সেই সম্মেলনেই বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেজন্য এদুটিকে ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানও বলা হয়ে থাকে। ওই সম্মেলনকেও বলা হয় ব্রেটন উডস সম্মেলন। ওই সম্মেলনে গৃহীত চুক্তিকে বলে ব্রেটন উডস চুক্তি।

১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস এলাকার মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা মিলে গড়ে তোলেন আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক।

তারপর থেকে যে কোনও দুর্দশাপীড়িত দেশের অর্থ পাওয়ার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএমএফ। আর্থিক সঙ্কটে জর্জর ইউরোপের দেশ গ্রিস থেকে শুরু করে দেনার ভারে নুইয়ে পড়া লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, এমনকি ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যেরও সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আইএমএফ।

জরুরি ভিত্তিতে কোনও দেশের লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় অর্থ ধার দিয়ে থাকে আইএমএফ।

তবে এই ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্তও জুড়ে দেয় সংস্থাটি। এর মধ্যে সাধারণত থাকে ঋণ গ্রহীতা দেশে আর্থিক খাত সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, বাজেটে স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতি দূর করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো ইত্যাদি।

আবার জিডিপি ও প্রবৃদ্ধির হিসাব করতে আইএমএফের ডাটা বা তথ্য ব্যবহার করে সদস্য দেশগুলো। আবার এই তথ্য মূল্যায়ন করে আইএমএফও ঠিক করে, কোনও দেশ কী পরিমাণ অরথ ঋণ পেতে পারে।

বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। তাদের ঋণ সড়ক, রেলপথ তৈরি থেকে শুরু করে বাধ নির্মাণসহ আর্থিক খাত উন্নয়নে দেওয়া হয়ে থাকে।

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটি প্রতিষ্ঠানই সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নানা নীতি পরামর্শ দিয়ে থাকে।

তহবিল আসে কোত্থেকে

বিশ্ব ব্যাংকের তহবিলের উৎস বেশ কয়েকটি। শুরুতে ধনী সদস্য দেশগুলো এতে তহবিল জুগিয়ে আসছিল। এখন বিশ্ব ব্যাংক পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে।

আইএমএফের তহবিলও আসে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে। কে কত অর্থ দেবে, তার একটি কোটা নির্ধারিত রয়েছে।

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ উভয়েরই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তহবিলে কে কত অর্থ দিল, সেই দেশ অগ্রাধিকার পায়। কেননা এখানে এক দেশ এক ভোট প্রথা নেই; কে কত অর্থ তহবিলে রাখল, তার ওপর নির্ধারিত হয় ভোটের হার।

বর্তমানে আইএমএফের সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯১। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য হতে হলে আগে আইএমএফের সদস্য হতে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য দেশ এখন ১৮৯টি।   

ওয়াশিংটনে আইএমএফের সদর দপ্তর।

আইএমএফ কাদের প্রয়োজন

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বড় প্রয়োজন আইএমএফকে। আইএমএফের ঋণ সহায়তা ছাড়া আর্জেন্টিনা সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিতে পারত না। আফ্রিকার দেশ সেনেগাল থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কারও নগদ অর্থের সঙ্কট কাটত না আইএমএফের সহায়তা ছাড়া।

আইএমএফের বিভিন্ন কর্মসূচি বিশ্বের নানা দেশেই সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগকারীর ঋণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

“আইএমএফ দীর্ঘ দিন ধরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণ নিতে আগ্রহীদের একটি বড় ঠিকানা,” বলেন ইউরোপের সর্ববৃহৎ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আমুন্ডির প্রধান ইয়েরলান সুজদাইকভ।

তিনি আরও বলেন, শুধু ঋণ দেওয়াই নয়, তাদের অর্থ বিনিয়োগকারীদের ওপর আস্থা বাড়াতেও সহায়তা করে।

সৌদি আরবের মতো দ্বিপক্ষীয়ভাবে ঋণদাতা দেশও আইএমএফের মাধ্যমে অর্থ দিতে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। দেশটির অর্থমন্ত্রঅ ফয়সাল আলইব্রাহিম বলেন, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফকে সংযুক্ত করা এর মূল্যমান বাড়িতে তোলে।

বিশ্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে কী

বিশ্বে বিনিয়োগকারীরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকে বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে। আইএফসি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের বিভিন্ন প্রকল্পে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে থাকে, অবকাঠামো থেমে শুরু করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানকে তহবিল জুগিয়ে থাকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে সুস্থির রাখার লক্ষ্যে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি যেন কার্যকর থাকে, সেই জন্য।

বড় অঙ্কের অর্থ জুগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডানের মতো দেশকে সহায়তা দেয়, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, বলছেন মার্ক সেবাল।

যুক্তরাষ্ট্রের অফিসিয়াল মনেটারি অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের চেয়ারম্যান সেবাল এক সময় আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন।

“যদি এসব দেশে অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে,” যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের দিকটি দেখিয়ে বলেন তিনি।

ওয়াশিংটনে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দপ্তর।
ওয়াশিংটনে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দপ্তর।

উন্নয়নশীল বিশ্বের চাওয়া কতটা

জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো কিংবা রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকারকে খড়গহস্ত হওয়ার মতো অজনপ্রিয় পরামর্শ দেওয়ার কারণে উন্নয়নশীল অনেক দেশে প্রায়ই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় আইএমএফকে।

গত গ্রীষ্মে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় আইএমএফের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।

কিউবা, উত্তর কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো দেশগুলো আইএমএফের সদস্যই হয়নি।

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটোরই সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে।

যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে কী হবে

“এটা হবে বড় ধরনের একটি বিপর্যয়,” বলছিলেন কান নাজলি। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিউবার্গার বারম্যানের কর্মকর্তা তিনি।

প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বড় শেয়ারের মালিক। আইএমএফে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার ১৬ শতাংশ, বিশ্ব ব্যাংকে তার খানিকটা কম।

এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনকে ছড়ি ঘোরাতে সহায়তা করে।

তুলনামূলক কম খরচ করে যেখানে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব রাখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুযোগ ছেড়ে দেওয়াকে বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করবে।

সেই সঙ্গে তার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতে চীনের প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলবে, যেখানে চীনের হাতে এখন আইএমএফের ৫ শতাংশের মতো শেয়ার রয়েছে।  

আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য মার্ক সেবালের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া চীনের জন্য বড় সুযোগ এনে দেবে।

আর যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে দেশটির কোম্পানিগুলোর বিশ্ব ব্যাংকের তহবিল পাওয়া কমে যেতে পারে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো সতর্ক করে আসছে, তেমনটা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনকার ট্রিপল-এ রেটিং ঝুঁকিতে পড়তে পারে, কারণ তাদের ধার দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত