Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

ট্রাম্পের নতুন মিত্র কারা, পুরনোদের কেন উদ্বেগ

হোয়াইট হাউসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
[publishpress_authors_box]

বন্ধুর পরিচয়েই মানুষ চেনা যায়। প্রবাদটি সত্যি হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে কী পরিকল্পনা করছেন, তা হয়তো বোঝা যাবে।

এই সপ্তাহে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের নিন্দা জানানো হয়েছিল। এটি ছিল মূলত যুদ্ধের তৃতীয় বর্ষপূর্তির দিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেসব দেশের সঙ্গে রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, বেলারুশ ও সুদান। আর আর যাদের বিপক্ষে গেছেন, তারা হলো- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ইতালি, জাপান এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশ।

ট্রাম্প মাত্র এক মাস হলো আবার ক্ষমতায় এসেছেন। এর মধ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে দিচ্ছেন। তিনি নিজের দেশকে এমন রাষ্ট্রগুলোর পাশে রাখছেন, যেগুলোর অধিকাংশই বিদ্রোহী দেশ হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে তিনি তাদের বিরোধিতা করছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হওয়া, দেশটির ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই সপ্তাহে পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ওয়াশিংটনে আসছেন। তাদের লক্ষ্য ট্রাম্পকে আবার মিত্রদের পক্ষে নিয়ে আসা।

কিন্তু তারা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ট্রাম্প তাদের মূল্যবোধের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন, তাদের অগ্রাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে মিলছে না।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ রাষ্ট্রদূত ডরোথি শিয়া। নিরাপত্তা পরিষদে ইউক্রেনের জন্য শান্তির আহ্বান জানিয়ে আনীত এক প্রস্তাবে ভোট দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার মতো আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশগুলোর পাশে দাঁড়ালে ইউরোপ, কানাডা এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় মিত্ররা নতুন জোটের পথ খুঁজতে পারে।

একই সঙ্গে মস্কোর প্রতি ট্রাম্পের নমনীয় অবস্থান রাশিয়াকে কূটনৈতিক একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। গত তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের নীতির ফলে সেই প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুজান ই. রাইস বলেন, “ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই নির্দ্বিধায় রাশিয়ার স্বার্থে কাজ করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষদের সঙ্গে যুক্ত করছেন এবং চুক্তিভিত্তিক মিত্রদের বিপক্ষে দাঁড় করাচ্ছেন। এখন আমাদের সবারই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত— কেন তিনি এমন করছেন?”

সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভোট ইউরোপীয় নেতাদের বিস্মিত ও হতভম্ব করেছে। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদে একটি বিকল্প প্রস্তাব আনতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগও তাদের বিভ্রান্ত করেছে। সেই প্রস্তাবে রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণের জন্য দায়ী করা হয়নি।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া একসঙ্গে ভোট দেয়। আর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

এমনকি কিছু রিপাবলিকান নেতা, যারা এতদিন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেননি। তারাও এবার চুপ থাকতে পারেননি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাদের প্রকাশ্যে কথা বলতে বাধ্য করেছে।

উটাহ থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান সেনেটর জন কার্টিস সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “আজ জাতিসংঘে দেওয়া ভোট আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এতে আমরা রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছি। এরা আমাদের মিত্র নয়। এই অবস্থান স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আমেরিকান আদর্শের বিপরীত। আমরা সবাই যুদ্ধের অবসান চাই। তবে তা এমন শর্তে হতে হবে, যা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং পুতিনকে নতুন ভূখণ্ড দখলের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখবে।”

উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নেব্রাস্কার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন বেকন হতাশা প্রকাশ করেছেন যে প্রেসিডেন্ট একজন আগ্রাসীর পক্ষ নিয়েছেন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন আজ ইউক্রেন ইস্যুতে গুরুতর ভুল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ স্বাধীনতা, মুক্ত বাজার ও স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে এবং দখলদার ও আগ্রাসীর বিরুদ্ধে।”

এদিকে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা বলছেন, তিনি যুদ্ধ বন্ধের জন্য জটিল ও সংবেদনশীল আলোচনা শুরু করেছেন। তাদের মতে, যারা তাকে রাশিয়ার বক্তব্য অনুসরণ করার জন্য সমালোচনা করছেন, তারা আসলে ইউক্রেনে সহিংসতা বন্ধের বিরোধী। তারা আরও যুক্তি দেন, আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শান্তি আনতে পারেননি। তাই ট্রাম্পের কৌশলই ভালো হতে পারে।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ট্রাম্প ভালোভাবে চুক্তি করতে জানেন। চুক্তি করার জন্য উভয় পক্ষকে আলোচনা করতে আসতে হয়। সাধারণত, যখন আপনি একটি ভালো চুক্তি করেন, উভয় পক্ষই কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে আলোচনা থেকে বেরিয়ে যান।”

লক্ষ্য যদি ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দূরে রাখার, তাহলে ট্রাম্প তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি যুদ্ধের অপর পক্ষে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। ট্রাম্প পুতিন বা রাশিয়াকে সমালোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, ইউক্রেন ‘যুদ্ধ শুরু করেছে’ এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত জেলেনস্কিকে ‘নির্বাচনহীন এক স্বৈরশাসক’ বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত উত্তর কোরিয়া ও বেলারুশের মতো দেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একমত হয় না। একই সময় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে দূরত্ব রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের সঙ্গে জাতিসংঘে সবচেয়ে বেশি ভোট দিয়েছে, তাদের মধ্যে ছিল কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশে জাতিসংঘের ভোটে বিরোধী অবস্থানে ছিল, সেগুলোর মধ্যে ছিল সিরিয়া, নিকারাগুয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া, চীন, কিউবা, বেলারুশ ও রাশিয়া।

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তার প্রধান মিত্রদের সঙ্গে যেটা নিয়ে বিরোধে থাকে, তা হল ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাত। এতে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত জাতিসংঘের সেই প্রস্তাবগুলোর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা ইসরায়েলকে সমালোচনা করেছে। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলো সেগুলোর পক্ষে ভোট দেয়।

জাতিসংঘের সাবেক কূটনীতিকরা বলেছেন, তারা এমন কোনো সময় মনে করতে পারছেন না, যখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া এবং অন্যান্য বিচ্ছিন্ন দেশের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একসঙ্গে ভোট দিয়েছে।

সুজান রাইস বলেছেন, “যখন আমি জাতিসংঘে আমাদের দেশের প্রতিনিধি ছিলাম, যদি আমাকে বলা হত যে আমাদের ইউরোপের বন্ধুদের বিপক্ষে গিয়ে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং বেলারুশের মতো দেশগুলোর পক্ষে ভোট দিতে, তাহলে আমি ভাবতাম রাশিয়ানরা আমাদের কথা বলা বা যোগাযোগের পদ্ধতিতে কিছু সমস্যা সৃষ্টি করেছে।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৈশ্বিক একমত থেকে বাদ পড়ার বিষয়ে কোনো চিন্তা প্রকাশ করছেন না। তিনি এই সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে আপ্যায়ন করেছেন। এদিকে ম্যাক্রোঁ তাকে রাশিয়া সম্পর্কে আরো সতর্ক হতে এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা রক্ষায় বেশি প্রস্তুত থাকতে আভাস দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং করমর্দন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তাকে মোটেও উদ্বিগ্ন মনে হয়নি।

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে আপ্যায়ন করবেন ট্রাম্প। এই বৈঠকটি আটলান্টিক জোটের নতুন বাস্তবতাকে পরীক্ষার জন্য একটি সুযোগ হবে। ব্রিটিশ নেতা ইউরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার গুরুত্ব বোঝাতে চান। কিন্তু ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এতে তেমন কোনো আশা দেখছেন না।

বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের মতো নেতাদের প্রতি বিরক্ত নন। তিনি সবসময় স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করে আসছেন। ২০২১ সালে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর মার-এ-লাগোতে তার অফিসে তিনি কিমের সঙ্গে একটি ছবি টাঙিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রেসিডেন্টরা জাতীয় স্বার্থে কিছু অসৎ চরিত্র ও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছেন। তবে সাধারণত তারা এটি করতে একেবারে উচ্ছ্বাস দেখাননি এবং ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ক্ষতি করেননি। কিন্তু ট্রাম্প তার পূর্বসূরীদের তুলনায় বেশি দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।

ম্যাক্রোঁর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কথা উল্লেখ করেন। সিআইএ প্রিন্সকে একজন খুনি বলেছে। সংস্থাটির রিপোর্ট বলছে, যুবরাজ সালমান সাংবাদিক জামাল খাশোগির নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তার দেহ টুকরো করার নির্দেশ দেন। তবে ট্রাম্প যুবাজকে “একজন দুর্দান্ত তরুণ” বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, তিনি “বিশ্বব্যাপী অসাধারণ সম্মানিত।”

ট্রাম্প মনে করেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের জোটের অংশ নয়। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভোট দেওয়া জি৭ দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বিরোধিতা করেছে। ট্রাম্প কার্যত একটি নতুন ক্লাব গঠন করছেন। আর এই ক্লাবের সদস্য মস্কো, মিনস্ক ও পিয়ংইয়ং। এতে লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনের জায়গা নেই।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত