Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

নতুন সরকারের সময়েও ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ বাড়ছে

নতুন সরকারের সময়েও ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ বাড়ছে
আবদুর রহিম হারমাছি
রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২০:৪৬:০০

দাম ধরে রাখতে ডলার কিনেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রথম ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক; নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে আট ব্যাংকের কাছ থেকে ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে।

 

এ নিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫৩৮ কোটি (৫.৩৮ বিলিয়ন) ডলার কেনা হলো। আর এই ডলার কেনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে গত সাত মাসে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে।

 

মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

এর আগে সবশেষ ডলার কেনা হয় জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি; ওই দিনও ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯ ব্যাংক থেকে ২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংকের কাছ থেকে ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার কিনেছিল কিনেছিল ব্যাংক।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার সন্ধ্যায় এআরএইচ ডটকমকে বলেন, “আজ (রবিবার) ৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১২২ টাকা ৩০ টাকা কাট-অফ রেটে ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। এ নিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়ালো ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ (১.৪৫ বিলিয়ন) ডলার।”

 

আগের মাস জানুয়ারিতে একই দরে ৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। আর গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কেনা হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।

 

আর এই ডলার কেনা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।

 

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফনে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে অর্থাৎ ডলারের দর যাতে কমে না যায় সেজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

 

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, বাজার স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। ডলারের দর বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, আবার কমে যাওয়াও ভালো নয়। তাই এ বাজারকে ‘সুস্থির’ রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। তাতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে।”

 

বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দিকে হঠাৎ করেই ডলারের দর কমতে শুরু করে; ১২১ টাকায় নেমে আসে।

 

ডলারের দাম কমে গেলে রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে কারণেই দাম ধরে রাখতে নিলামে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

১৩ জুলাই প্রথম ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যংক। ওইদিন ১৮টি ব্যাংক থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনা হয়। ১৫ জুলাই একই দরে ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২৩ জুলাই ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা দরে ১ কোটি ডলার কেনা হয়।

 

এর পর ৭ আগস্ট ১২১ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ১০ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ১৪ আগস্ট ১২১ টাকা ৫০ পয়সা দরে ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলার, ২৮ আগস্ট ১২১ টাকা ৬৬ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৭০ পয়সা দরে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

 

আর এভাবেই ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত ডলার কিনেই চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে মোট অঙ্ক ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

 

আর এই ডলার কেনার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সাত মাসে ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) দিয়েছে। এতে ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়েছে।

 

তবে ডলার কিনে বাজারে টাকা সরবরাহ করায় মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব পড়ছে বলে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন।

 

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়; ৮৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১২৫ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

 

ডলারের বাজারের অস্থিরতায় দেশে মুল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে দিয়েছিল।

 

টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকাতে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে আমদানি বিল পরিশোধে সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে ডলার বিক্রি করেছিল, সেখানে এখন চলছে উল্টো প্রবাহ।

 

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করে, যা মূলত জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি বিল মেটাতে ব্যবহার হয়েছে।

 

রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত

 

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় নতুন বছরেও জোয়ার বইছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে। এই বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারির ২১ দিনেই ২৩০ কোটি ৮১ লাখ (২.৩১ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা।

 

এই অঙ্ক গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারির একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।

 

সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত মাস ২১ দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি) ২ হাজার ১৭৪ কোটি (২১.৭৪ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি।

 

দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।

আরও