২১ দিনে ২৩১ কোটি ডলার পাঠালেন প্রবাসীরা
রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২১:৫৪:০০
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহে উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; জোয়ার বইছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারির ২১ দিনে ২৩০ কোটি ৮০ লাখ (২.৩১ বিলিয়ন ডলার) দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা।
এই অঙ্ক গত বছরের ফেব্রুয়ারির একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির এই ২১ দিনে ১৯৩ কোটি ৩০ লাখ (১.৯১ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল দেশে। আর পুরো মাসে এসেছিল ২৫২ কোটি ২৭ লাখ (২.৫২ বিলিয়ন) ডলার।
সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত মাস ২১ দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি) ২ হাজার ১৭৪ কোটি (২১.৭৪ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের আলচ্য সময়ে (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি) ১ হাজার ৭৮৭ কোটি ৫০ লাখ (১৭.৮৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রবিবার রাতে রেমিটেন্স প্রবাহের এই তথ্য জানিয়েছেন।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে রোজা শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে বেশি রেমিটেন্স পাঠাবেন প্রবাসীরা। তখন রেমিটেন্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে আশার কথা জানান আরিফ খান।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মতো ফেব্রুয়ারিতেও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স দেশে আসবে।”
আর এই রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই। বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে। আর গ্রস বা মোট হিসাবে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
নিলামে ডলার কেনা রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি কারণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। গত সাত মাসে প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ দিনে (১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি) প্রবাসীরা মোট ২৩০ কোটি ৮১ লাখ ৪০ হাজার (২.৩১ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম দুই সপ্তাহে (১ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি) এসেছিল ১৩৫ কোটি ৪১ লাখ (১.৪১ বিলিয়ন) ডলার। পরের সপ্তাহে (১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি) এসেছে ৯৫ কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা) হিসাবে টাকার অঙ্কে ফেব্রুয়ারির ২১ দিনে ২৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ১১ কোটি ডলার; টাকায় ১ হজার ৩৪৪ কোটি টাকা।
ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনে। এই মাসের বাকি ৭ দিনে (২২ থেকে ও ২৮ ফেব্রুয়ারি) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের অঙ্ক ৩০৮ কোটি (৩.০৮ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। আর যদি সেটা হয়, তাহলে টানা তিন মাস ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসবে দেশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ (৩.১৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। য ছিল গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি। আর একক মাসের হিসাবে ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসেছিল ২১৮ কোটি ৫২ লাখ (২.১৮ বিলিয়ন) ডলার।
গত বছরের শেষ এবং চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরে প্রবাসীরা ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ (৩.২২ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। যা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ২২ দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। একক মাসের হিসাবে ডিসেম্বরে এসেছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স।
তার আগের মাস নভেম্বরে এসেছিল ২৮৯ কোটি (২.৯ বিলিয়ন) ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ (২.৫৬ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা; বেড়েছিল ৭ দশমিক শুন্য তিন শতাংশ। সেপ্টেম্বরে এসেছিল ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ (২.৬৮ বিলিয়ন) ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৯ লাখ (২.৪৮ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা; বেড়েছিল ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ দ্বিতীয় মাস আগস্টে আসে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ (২.৪২ বিলিয়ন) ডলার; প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ শতাংশের বেশি।
একক মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে; রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই মাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স আসে দেশে।
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৭৫ লাখ (৩০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠান প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থ বছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে রেমিটেন্স এসেছিল ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ (২.৫২ বিলিয়ন) ডলার। চলতি অর্থবছরের সাত মাসের (জুলাই-জানুয়ারি) হিসাবে গড়ে এসেছে ২৭৭ কোটি ৬০ লাখ (২.৭৭ বিলিয়ন) ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রেমিটেন্স এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে আসে ২ হাজার ২৬১ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থ বছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার।
২০২০-২১ অর্থ বছরে আসে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলার।
রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ছাড়াল
ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনায় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফনে রিজার্ভও বাড়ছে।
রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। গত কয়েক মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে।
গত ৭ জানুয়ারি রিজার্ভ বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ২৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। গ্রস হিসাবে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
৮ জানুয়ারি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের ১৫৩ কোটি (১.৫৩ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। আর গ্রস বা মোট রিজার্ভ নামে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে।
দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ফের ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। গত ২২ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে।
২৯ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এক সপ্তাহ পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রিজার্ভের সবশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিপিএম-৬ হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৬ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলারে।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই। অভ্যুত্থানের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও উদ্বেগ কাটছিল না।
তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় এবং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তার ঋণে রিজার্ভ স্বস্তির জায়গায় এসেছে।
সাড়ে ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মিটবে
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত ডিসেম্বর মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানের ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।