রপ্তানি আয় কমছেই, ফেব্রুয়ারিতে কমেছে ১২ শতাংশ
সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬ ১৮:০২:০০
বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের প্রধান উৎস রপ্তানি আয় কমছেই। টানা সাত মাস ধরে কমছে; গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারিতেও কমেছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক।
আর এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে অস্থিরতার কারণেই রপ্তানি আয় কমছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয় আরও কমবে। এতে অর্থনীতিতে সংকট বাড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা ও রপ্তানিকারক।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সোমবার রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারি পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৩.৪৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ কম। আর আগের মাস জানুয়ারি চেয়ে কম প্রায় ২১ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের অষ্টম মাস ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ (৪.৪১ বিলিয়ন) ডলার।
সামগ্রিক হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। এই আট মাসে (গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি) ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ (৩১.৯০ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ (৩২.৯৪ বিলিয়ন) ডলার।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক থেকে আয় কমার কারণেই রপ্তানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা হয়েছে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—এই চার মাসকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম (পিক আওয়ার) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই চার মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে বেশি আয় হয়ে থাকে।
কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ট্রাম্প শুল্পের ধাক্কায় ওলোটপালট বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই হাল হয়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
রপ্তানি আয়ে বড় উল্লম্ফন নিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর; অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৭৭ কোটি (৪.৭৭ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়, যা ছিল গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।
কিন্তু দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসেই হোঁচট খায়। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছিল। গত বছরের আগস্ট মাসের চেয়ে কমেছিল ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে আয় হয় ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৩.৬২ বিলিয়ন) ডলার; কমেছিল ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
চতুর্থ মাস অক্টোবরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩৮২ কোটি ৩৮ লাখ (৩.৮২ বিলিয়ন) ডলার। যা ছিল গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
পঞ্চম মাস নভেম্বরে ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ (৩.৮৯ বিলিয়ন) ডলার আয় করে বাংলাদেশ। যা ছিল গত অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরের চেয়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরে; ওই মাসে কমে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৯৬ কোটি ৮৩ লাখ (৩.৯৭ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪.৬৩ বিলিয়ন) ডলার।
সপ্তম মাস জানুয়ারিতে কমে দশমিক ৫০ শতাংশ। ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৪১ কোটি ৩৬ লাখ (৪.৪১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়। গত জানুয়ারিতে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৪৩ কোটি ৬০ লাখ (৪.৪৪ বিলিয়ন) ডলার।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে রিজার্ভ। এই সূচকের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই দুই সূচকে ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শুরু হয়েছিল।
এই আর্থিক বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স বেড়েছিল ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ; দ্বিতীয় মাস আগস্টে বাড়ে ৯ শতাংশ। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয় ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ। অক্টোবরে বাড়ে ৭ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। নভেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ডিসেম্বরে বেড়েছে ১৭ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ।
জানুয়ারি মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি, ৪৫ দশমিক ১১ শতাংশ। সবশেষ ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিটেন্স বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।
রেমিটেন্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলেও রপ্তানি আয় কমছেই। আর এটাই অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। শুধু রেমিটেন্স দিয়ে সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তারা।
গত এপ্রিল থেকে ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে একধরনের অস্থিরতা ছিল। ৩১ জুলাই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক এড়াতে জুলাই মাসে অনেক পণ্য জাহাজীকরণ করেন রপ্তানিকারকরা। স্থগিত থাকা অনেক পণ্যও রপ্তানি করেন। সে কারণে ওই মাসে রপ্তানি অনেক বেড়েছিল বলে মনে করেন পোশাক রপ্তানিকারকরা।
৭ আগস্ট থেকে ট্রাম্প শুল্ক কার্যকর হয় বাংলাদেশে। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের পণ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন এর সুফল বাংলাদেশ পাবে। তার লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল।
কিন্তু দেখা যায় উল্টো চিত্র। রপ্তানি না বেড়ে উল্টো কমতে থাকে।
এর মধ্যে ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে নতুন জটিলতা দেখা দেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন আইনে সব দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরের দিনই (২১ ফেব্রুয়ারি) তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন।
কেনো কমছে রপ্তানি আয় জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “গত সাত মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খাচ্ছে।”
“এ ছাড়া ভারত ও চীনসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ওই বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না, তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে তারা মূল্য কমিয়ে দিয়ে পোশাক রপ্তানির অর্ডার নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা একই ধরনের পণ্যের অর্ডার নিতে পারছেন না। ফলে ইউরোপীয় বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।”
“তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—তারা কীভাবে পারছে? এর কারণ হলো—ভারত সরকার মার্কিন শুল্কজনিত ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে তাদের ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে।”
“অন্যদিকে, আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রপ্তানি খাতের নগদ সহায়তাসহ নানা সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যে সামান্য সহায়তা অবশিষ্ট ছিল, তার মেয়াদও ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। সেটি নবায়নের জন্য আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি, যা রপ্তানিকারকদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে।”
“অন্যথায় রপ্তানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের স্পিনিং মিল গুলো, একটার পর একটা গার্মেন্টস বন্ধ হচ্ছে, যা রপ্তানি খাতের জন্য অসনি সংকেত।”
“এ ছাড়া সাধারণত যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের আগে আমাদের রপ্তানি আদেশ কিছুটা কমে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। সব সংশ্রয় কাটিয়ে একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে দেশে। আমরা আশা করেছিলাম নতুন সরকার শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেবে; রপ্তানি আয় ফের ইতিবাচক ধারায় ফিরবে।”
“কিন্তু এরই মধ্যে আরেকটি ধাক্কা খেলাম আমরা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় বড় সক হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে। জানি না এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে; আমাদের কী হবে?” বলেন মোহাম্মদ হাতেম।
একই কথা বলেছেন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “একটার পর একটা ধাক্কা লেগেই আছে; সেই যে করোনা মহামারি থেকে শুরু হয়েছিল। তার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ট্রাম্প শুল্ক, দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন; সংকটের পর সংকট। নতুন সরকার আসার পর ভেবেছিলাম সবকিছু এখন ভালোর দিকে যাবে। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই শুরু হয়ে গেছে আরেকটি যুদ্ধ। জানি না আমাদের কপালে কী আছে,?”
পারভেজ বলেন, “আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকা ও ইউরোপ। ওই দুই জায়গাতেই রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প শুল্কের কারণে আমেরিকার বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এখন তারা তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য কম কিনছে। তার একটা প্রভাব পড়েছে আমাদের রপ্তানিতে।”
“অন্যদিকে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্ধি চীন ও ভারত আমেরিকার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপের বাজারে আগের চেয়ে বেশি বেশি পণ্য রপ্তানি করছে। অনেকে ক্ষেত্রে কম দামেও পোশাক রপ্তানি করছে তারা। সে কারণে ইউরোপের বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।”
অর্থনীতির গবেষক বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির প্রধান দুই সূচক রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সংকট কেটে যাওয়ার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু রপ্তানি আয় টানা সাত কয়েক মাস কমায় সেটা হোঁচট খেয়েছে।”
“এরই মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও জড়িয়ে পড়েছে; এই সব দেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে দেশে। এতে রেমিটেন্স প্রবাহও ধাক্কা খাবে। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিটেন্সও যদি কমে যায়, তাহলে রিজার্ভে টান পড়বে। তখন নতুন আরেকটি সংকট দেখা দেকে।
৮ মাসে সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে ৩.১৫%
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পাঁচ মাস পর্যন্ত (জুলাই-নভেম্বর) পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। ওই পাঁচ মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। মূলত প্রথম মাস জুলাইয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণেই ওই প্রবৃদ্ধি ছিল।
কিন্তু ডিসেম্বরে ধসের পর সামগ্রিক রপ্তানিতে নেতিবাচক (নেগেটিভ) প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়। জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারিতেও সেই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমার কারণেই রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। এই মাসে ২৮১ কোটি ৫৯ লাখ (২.৮১বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩২৪ কোটি ৪৪ লাখ (৩.২৪ বিলিয়ন) ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আট মাসের হিসাবে অর্থাৎ জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ (২৫.৭৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম।
গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয়ের অঙ্ক ছিল ২ হাজার ৬৭৯ কোটি ৬৪ লাখ (২৬.৭৯ বিলিয়ন) ডলার।
গত বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৯ লাখ (৪৮.২৮ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থ বছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে শেষ মাস জুনে ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ (৩.৩৪ বিলিয়ন) ডলার আয় করেন বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা। এপ্রিল মাসে আয়ের অঙ্ক ছিল ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলার। মার্চে আয় হয়েছিল ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ (৪.২৫ বিলিয়ন) ডলার। ফেব্রুয়ারিতে আয়ের অঙ্ক ছিল ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার।
২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৪৪৩ কোটি ৬০ লাখ (৪.৪৩ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেন রপ্তানিকারকরা। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে আয় হয়েছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪.৬২ বিলিয়ন) ডলার।
নভেম্বর মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৪১১ কোটি ৯৭ লাখ (৪.১২ বিলিয়ন) ডলার; অক্টোবরে আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বরে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার; আগস্ট ও জুলাইয়ে আয়ের অঙ্ক ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক শূন্য তিন ও ৩ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।
৮০.৬৫ শতাংশই এসেছে পোশাক থেকে
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক; অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা আসে এই খাত থেকে। ফেব্রুয়ারিতে এই খাত থেকে ২৮১ কোটি ৫৯ লাখ (২.৮১ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে। এই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৩.৪৯ বিলিয়ন) ডলার।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারিতে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৫৬ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।
ফেব্রুয়ারিতে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার; গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে যা ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। আর ওভেন পোশাক থেকে আয় কমেছে ১০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আয় এসেছে ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থবছরের আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) হিসাবে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে।
অন্যান্য খাত
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে ৬ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার আয় হয়েছে। কমেছে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এই মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় কমেছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এই খাত থেকে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই অঙ্ক ছিল ৯ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
তবে এই মাসে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি থেকে আয় কমেছে দশমিক ৮০ শতাংশ।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থ বছরের (২০২২-২৩) চেয়ে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ের অঙ্ক ছিল ৪৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২২-২৩) চেয়ে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ কম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি (৫৫ বিলিয়ন) ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।