জ্বালানি তেলের দামে লাফ, লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ল
রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:১২:০০
শেষ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল সরকার। চার ধরনের তেলের নতুন দর লিটারপ্রতি আগের চেয়ে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
শনিবার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, শনিবার মধ্যরাত থেকে কার্যকর হবে।
ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাসের মাথায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালো তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতনের মধ্যে দেশের বাজারে বাড়ানো হলো।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দামে ধস নামে; এক পর্যায়ে ১৩ শতাংশ কমে যায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণার পর অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১২ ডলার ৮৭ সেন্ট কমে ৮৬ দশমিক ৫২ ডলারে নেমে এসেছে। শতাংশ হিসাবে কমে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম সাড়ে ১৩ ডলার বা ১৪ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮১ দশমিক ১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এক পর্যায় প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে উঠে যায়। তখন অবশ্য তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার।
৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির খবরে তা কমে ১০০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। শুক্রবার হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্তের খবরে বড় দরপতন হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রতিলিটার ডিজেলের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে ১১৫ টাকা। অকটেন ১৪০, পেট্রোল ১৩৫ এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা।
এতে করে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা (আগের দর ১০০ টাকা), অকটেন বেড়েছে ২০ টাকা (আগের দর ১২০), পেট্রোল বেড়েছে ১৯ টাকা (আগের দর ১১৬) এবং কেরোসিন বেড়েছে ১৮ টাকা (আগের দর ১১২)।
এর আগে বেশ কয়েক মাস ধরে এ চার ধরনের তেলের দাম প্রায়ই একই রকম ছিল। সবশেষ এপ্রিলেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। আর এর আগের কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সমন্বয় করতে বাড়ানো বা কমানো হলেও তা এক দুই টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার ওঠানামার মধ্যে এবার এক লাফে তা ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হল।
শনিবার নতুন দর নির্ধারণের বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এর আগে জেট ফুয়েলের দর বাড়ানো হয় কয়েক দফায়। দাম বেড়েছে ফার্নেস অয়েলেরও।
সরকারের তরফে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর কথা বলা হলেও ৭ এপ্রিল ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল প্রয়োজন হলে মে মাসে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে ভর্তুকির চাপ সামলাতে এপ্রিলের মাঝামাঝিতেই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল সরকার।
জ্বালানি তেলের নতুন দর নির্ধারণের এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের পরের কিস্তির অর্থ পেতে জোর দেন দরবার চালাচ্ছে সরকার।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে জনস্বার্থে ভর্তুকি বাড়ানোর কথা বলেছিলেন।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়ানোর ঘোষণা এল।
সবশেষ ৩১ মার্চ রাতে এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম ঘোষণার সময় তা অপরিবর্তিত রেখেছিল সরকার। তখন ভোক্তা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেল ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। ওই কাঠামোর আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে মিল রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে সারা বিশ্বে যখন লকডাউন চলছিল, তখন জ্বালানি তেলের দাম মাইনাস ৩৭ ডলারে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ এক ব্যারেল তেল কিনলে ক্রেতাকে উল্টো ৩৭ ডলার দিতে হয়।
এরপর ওপেক ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে তেল সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি করে। সে বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৪২ ডলার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ছিল ৪৯ ডলার।
সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৫৩ ডলার, মার্চে ৬০ ডলার, এপ্রিলে ৬৫ ডলার, মে তে ৬৪ ডলার, জুনে ৬৬ ডলার, জুলাইয়ে ৭৩ ডলার এবং আগস্টে ৭৪ ডলার।
অক্টোবরে সেই দাম ওঠে ৮৫ ডলারে। সে সময় দেশের বাজারেও তেলের দাম বাড়ানো হয়।
এরপর তেলের দাম খানিকটা কমে আসে। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম ফের বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।
পরে অবশ্য তা কমে আসে; ৮০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে লেনদেন হয়।
এর পর গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় দরপতন হয়।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারে নেমে আসে। আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দর নামে ৬৪ ডলারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগে বিশ্ববাজারে এই দুই অপরিশোধিত তেলের দাম ৬০ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যেই ছিল।