Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয়, পুঁজিবাজারে দরপতন

যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয়, পুঁজিবাজারে দরপতন
সকাল সন্ধ্যা প্রতিবেদন
বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৯:৩৭:০০

যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয় দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দেশের প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬০ পয়েন্টের বেশি কমেছে; কমেছে লেনদেনের অঙ্ক। কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র দেখা গেছে।

 

৩৯ দিনের টানা উত্তেজনার পর মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আর এর ইতিবাচক প্রভাব বিশ্বের বড় বড় বাজারের মতো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও পড়ে। মূল্যসূচকের উল্লম্ফনে চাঙাভাব দেখা দেয় বাজারে।

 

সপ্তাহের চতুর্থ দিন বুধবার (৮ এপ্রিল) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৬১ পয়েন্টের বেশি বেড়েছিল; লেনদেন হয় প্রায় হাজার কোটি টাকা। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক সূচক সিএএসপিআই বেড়েছিল ৩২৮ পয়েন্ট। বেড়েছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর।

 

কিন্তু ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিন ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুমকি দিয়ে বলেছেন, যেখানে প্রয়োজন সেখানে গিয়ে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাবে ইসরায়েল।

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান লেবাননের জনগণের সঙ্গেই থাকবে।

 

আর এতেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশ্রয় দেখা দিয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় পতন হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এই সামরিক সংঘাত ইতিমধ্যে রণক্ষেত্র ছাড়িয়ে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি–সংকট বেড়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ–শৃঙ্খল ও বাণিজ্যে বিঘ্ন, দেশে দেশে আর্থিক বাজারে কড়াকড়ি এবং পর্যটন ও প্রবাসী আয়ে (রেমিটেন্স) নেতিবাচক প্রভাব।

 

এই যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও পড়েছিল। দু-একদিন ছাড়া প্রায় প্রতিদিনই সূচক পড়ছিল; কমছিল লেনদেন। ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।

 

এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনের এই খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে গত কদিনের তুলনায় বুধবার ব্যাপক উত্থান দিয়ে লেনদেন শেষ করে দেশের দুই পুঁজিবাজার।

 

বাজার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেনের শেষদিকে তা পতনে রূপ নেয়। তবে বুধবার সকাল থেকেই সূচকের বড় উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শুরু হয়। লেনদেন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত ছিল।

 

যুদ্ধের দামামায় চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবার (৫ এপ্রিল) বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বড় দরপতন হয়; ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০০ পয়েন্টের বেশি কমেছিল। অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই কমেছিল ২২৮ পয়েন্ট। মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনও কমেছে দুই বাজারে। কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দর।

 

পরের দুই দিন অবশ্য দুই বাজারেই সূচক খানিকটা বাড়ে। ৬ এপ্রিল (সোমবার) ডিএসইএক্স ৩৪ পয়েন্ট বেড়েছিল; ৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) বাড়ে ১০ পয়েন্টের মতো।

 

ইতিবাচক ধারায় থাকা বাজারে যুদ্ধবিরতির খবরে সপ্তাহের চতুর্থ দিন বুধবার আরও লাফ দিয়েছে। আর এতে খুশি হন বিনিয়োগকারীরা। আগামী দিনগুলোতেও এই চাঙাভাব অব্যাহত থাকবে বলে আশা করেন তারা।

 

কিন্তু একদিন না যেতেই সেই আশায় গুড়েবালি; আবারও হতাশ ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারী।

 

বাজারেরে এই অস্থিরতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল রিজভী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ইরান যুদ্ধের বিরতির সংবাদে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হয়ে লেনদেন বাড়িয়েছিলেন। সে কারণেই সূচকের বড় উত্থান হয়েছিল বুধবার।

 

“এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভয়-আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। যুদ্ধ বিরতির খবর বিনিয়োগকারীদের আশা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় বাজার ভালো হবে না—ভেবে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন সবাই। বিক্রির চাপেই বৃহস্পতিবার দরপতন হয়েছে বাজারে।”

 

বৃহস্পতিবারের বাজার পরিস্থিতি

 

যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয় দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশের দুই পুঁজিবাজারেই দরপতন হয়ছে।

 

বাজার পর্যালোচনা দেখা যায়, সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। এতে লেনদেনের শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকে। ফলে দাম কমার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি সবকটি মূল্যসূচকের বড় পতন দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।

 

দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ৩০৬টির। আর ১৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪২টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৩টির দাম কমেছে এবং ৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ১৬টি কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৬১টির এবং ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১২টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯২টির এবং ৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২টির দাম বেড়েছে এবং ২৭টির দাম কমেছে ও ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৬০ দশমিক পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক ৭০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ২৩ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ২ পয়েন্টে নেমে গেছে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

 

সবকটি মূল্যসূচক কমার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৭৭৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৯৯১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

 

এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কমেছে ২১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

 

এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের শেয়ার। কোম্পানিটির ৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা একমি পেস্টিসাইড শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকার। ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে লাভেলো আইসক্রিম।

 

এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে- ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, সিটি ব্যাংক, কেডিএস এক্সসরিজ, মনোস্পুল বাংলাদেশ, সামিট এলায়েন্স পোর্ট, ওরিয়ন ইনফিউশন এবং বিডি অটোকার।

 

অন্য বাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ৪৪ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১০৭টির এবং ১৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

 

লেনদেন হয়েছে ১১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

আরও