রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০০:০১:০০
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ বেড়েই চলেছে; বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গ্রস বা মোট হিসাবে প্রায় ৩৫ বিলিয়নের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার রাতে সকাল সন্ধ্যাকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দিন শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছড়িয়ে ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আর গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফন এবং ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার কারণে রিজার্ভ এই সন্তোষজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানের এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ কমতে কমতে প্রায় তলানিতে নেমে এসেছিল। তিন মাসের আমদানি খরচও ছিল না। আর সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল এই সূচক।
সে বিবেচনায় সন্তোষজনক রিজার্ভ নিয়েই শুরু হলো তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা।
রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স। গত ছয় মাস ধরে রপ্তানি আয় টানা কমলেও রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে।
গত ৭ জানুয়ারি রিজার্ভ বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ২৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। গ্রস হিসাবে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
৮ জানুয়ারি এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) নভেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের ১৫৩ কোটি (১.৫৩ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। গ্রস রিজার্ভ নামে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে।
দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। গত ২২ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে।
২৯ জানুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ বেড়ে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এক সপ্তাহ পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।
এভাবে বাড়তে বাড়তে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে ওঠে; গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সেই রিজার্ভ আরও বেড়ে বিপিএম-৬ হিসাবে ৩০ বিলিয়ন ডলার ছড়িয়ে ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আর গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই। অভ্যুত্থানের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও উদ্বেগ কাটছিল না।
তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় এবং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তার ঋণে রিজার্ভ স্বস্তির জায়গায় এসেছে।
বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে এবং সংস্থাটির সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।”
৫ মাসের আমদানি ব্যয় মিটবে
বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।
সবশেষ গত ডিসেম্বর মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সে হিসাবে বর্তমানের ৩০ দশমিক শূন্য ছয় বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে পৌনে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।
আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আকুর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তার আগে রিজার্ভ আরও বাড়কে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তার মূল্য প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়।
আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। এর মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশগুলো থেকে বেশি পরিমাণে ডলার আয় করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ দেশকেই আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় হিসাবে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়।
ব্যাংকগুলো আমদানির খরচ নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়, যা রিজার্ভে যোগ হয়। ওই দায় দুই মাস পরপর রিজার্ভ থেকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।
এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।
রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার শেষের দিকে আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়। তাদের শর্ত মেনে ২০২৩ সাল থেকে রিজার্ভের তথ্য গ্রস হিসাবের পাশাপাশি আইএমএফ অনৃসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিও প্রকাশ শুরু করে।
এখন বিপিএম-৬ ও গ্রস হিসাবের পাশাপাশি রিজার্ভের নিট বা প্রকৃত হিসাবও করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। মাঝে-মধ্যে প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ (তখন বিপিএম-৬ ও নিট হিসাবে প্রকাশ করা হতো না) ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে গত বছরের জুলাই শেষে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।
রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় নতুন বছরেও জোয়ার বইছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে। এই বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারির ১৮ দিনেই ২১২ কোটি ৬০ লাখ (২.১৩ বিলিয়ন ডলার) দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা।
বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা) হিসাবে টকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ২৬ হাজার কোটি টাকা। যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির একই সময়ের চেয়ে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত মাস ১৮ দিনে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি) ২ হাজার ১৫৫ কোটি ৯০ লাখ (২১.৫৬ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে দেশে রোজা শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে বেশি রেমিটেন্স পাঠাবেন প্রবাসীরা। তখন রেমিটেন্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ খান।
তিনি বলেন, “রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মতো ফেব্রুয়ারিতেও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স দেশে আসবে।”
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।
৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
দাম ধরে রাখতে ডলার কিনেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জাতীয় নির্বাচনের আগে ১০ ফেব্রুয়ারি নিলামের মাধ্যমে ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে ১১ ব্যাংকের কাছ থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের দিন ৯ ফেব্রুয়ারি একই দরে ১৯ ব্যাংকের কাছ থেকে ২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল।
৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ ব্যাংকের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। তার দুই দিন আগে ৩ ফেব্রুয়ারি কেনা হয়েছিল ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার; ২ ফেব্রুয়ারি কেনা হয় ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার।
এ নিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে পাঁচ দফায় ৯৬ কোটি ৬০ লাখ (প্রায় ১ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের মাস জানুয়ারিতে ছয় দফায় ৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়েছিল। আর গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে কেনা হয়েছিল ১ দশমিক শূন্য নয় বিলিয়ন ডলার।
সব মিলয়ে গত সাত মাসে (গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে এই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি) ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার পরিমাণ ৪৯০ কোটি (প্রায় ৫ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৩ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।