৭ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ২১%
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২১:৩০:০০
দেড় বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকে আন্দোলন ও পরে অগাস্টে ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্টি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভোটের আগে দেশে উন্নয়ন কাজের ধুম পড়ে যায়। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ক্ষমতাশীল সরকার সারা দেশে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
সবশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা গেছে; একটার পর একটা উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের সময় তেমনটি দেখা যায়নি। সে কারণেই সরকারের উন্নয়ন কাজে বেশ মন্থরগতি দেখা যাচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে; দলটি সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ দুটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। তিনি বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দিয়েছেন। ঢাকা-১৭ আসন রেখেছেন।
বিএনপির আগের ঘোষণা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।
রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় এখন এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে আশা করছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সোমবার এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা অর্থ ব্যয় হয়েছে; যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ৯ হাজার৩২০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
অর্থবছরের মোট বরাদ্দের হিসেবে এই সাত মাসে বাস্তবায়নের হার ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৭৪ হাজার ৪৬৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচ করেছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক হওয়ায় গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পসহ এডিপির আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা করা হয়।
আইএমইডির তথ্যে দেখা যায়, সবশেষ জানুয়ারি মাসে ৮ হাজার ৬৭৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। গত অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে খরচের অঙ্ক ছিল ১২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি ৯ হাজার ৮৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস করেছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার সেই এডিপি কমিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছিল। যার মধ্যে খরচ করা হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যা ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তার আগের অর্থ বছরে (২০২৩-২৪) এই হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
মাঠ পর্যায়ের কাজে ঢিমেতালের পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়।
এতে করে আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও স্থগিত হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এডিপির বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় কমে যায়।
সাধারণত অর্থবছরের প্রথমদিকে এডিপির ব্যয়ের পরিমাণ কম থাকে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর গত অর্থবছরে তা আরও কম বাস্তবায়ন হয়।
এর আগের ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৩০ দশমিক ২১ শতাংশ, ২৮ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং ২৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ ১৫ মন্ত্রণালয়ের গড় বাস্তবায়নের হার ২৪.৫২%
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।
এই অর্থবছরের জন্য সরকার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার যে এডিপি অনুমোদন দিয়েছে, তাতে ৭৪ দশমিক ৫৬ শতাংশই বরাদ্দ পেয়েছে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
এর মধ্যে শতাংশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৪১ দশমিক ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৬৬ শতাংশ ব্যয় করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৯১ শতাংশ খরচ করেছে স্থানীয় সরকার সম্পদ বিভাগ।
এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৩৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। কৃষি মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। সেতু বিভাগ খরচ করেছে ২৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ; বিদ্যুৎ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ২৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ২৬ দশমিক শূন্য এক শতাংশ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৩ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ মাত্র ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২৩ দশমিক শূন্য চার শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।