Beta
Logo

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

রেমিটেন্স : সাড়ে ৯ মাসেই এল ২৮ বিলিয়ন ডলার

রেমিটেন্স : সাড়ে ৯ মাসেই এল ২৮ বিলিয়ন ডলার
আবদুর রহিম হারমাছি
বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ২২:৪২:০০

যুদ্ধের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত রয়েছে; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিলের ১৫ দিনে ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ (১.৭৮ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা।

 

সব মিলিয়ে এই আর্থিক বছরের সাড়ে নয় মাসে (গত বছরের ১ জুলাই থেকে এই বছরের ১৫ এপ্রিল) ২৮ বিলিয়ন (২ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অর্থবছরের বাকি আড়াই মাসে (১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এলে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এবার ৩৫ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসবে বলে হিসাব বলছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রেমিটেন্স প্রবাহের প্রতিদিনের তথ্য জানিয়েছে বলেন, সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) ১৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে অর্থাৎ ১ থেকে ১৫ এপ্রিল ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ (১.৭৮ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন। যা গত বছরের এপ্রিলের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি।

 

২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনে ১৪৭ কোটি ২০ লাখ (১.৪৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন; পুরো মাসে এসেছিল ২৭৫ কোটি ২৩ লাখ (২.৭৫ বিলিয়ন) ডলার।

 

অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকের ঊর্ধ্বগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে আরিফ খান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ঈদের পরও রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল মধ্যপাচ্যে যুদ্ধের কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।”

 

তিনি বলেন, “প্রতিবারই দুই ঈদের পর রেমিটেন্স প্রবাহ বেশ কমে যায়। এবার কমেনি। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো।”

 

চলতি অর্থবছরের বাকি আড়াই মাসে (১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন) এই হারে এল এবার অর্থবছর শেষে রেমিটেন্সের মোট অঙ্ক ৩৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৩৭ কোটি) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে বলে হিসাব দেন তিনি।

 

রেমিটেন্সে প্রতি ডলারে এখন ১২৩ টাকার মতো দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সে হিসাবে এপ্রিলের প্রথমার্ধে (১ থেকে ১৫ এপ্রিল) প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ১১ কোটি ৯২ লাখ ডলার; টাকায় ১ হজার ৪৬৬ কোটি টাকা।

 

বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) একদিনে এসেছে ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকা।

 

মাসের বাকি ১৫ দিনে (১৬ থেকে ৩০ এপ্রিল) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের অঙ্ক ৩৫৭ কোটি (৩.৫৭ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। আর সেটা যদি হয়, তাহলে একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসবে এপ্রিলে।

 

সব মিলিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত (সাড়ে ৯ মাস, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল) মোট ২ হাজার ৭৯৯ কোটি ৬০ লাখ (২৮ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি।

 

২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত (৯ মাস ১৫ দিন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল) ২ হাজার ৩২৫ কোটি ৭০ লাখ (২৩.২৬ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল দেশে।

 

গত মার্চ মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। একক মাসের হিসাবে যা সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক মাসে এত রেমিটেন্স দেশে আসেনি।

 

রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত বছরের মার্চে, ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার। ওই মাসেও রোজা ও ঈদ সামনে রেখে রেকর্ড হয়েছিল প্রবাসী আয়ে।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চালায়। পাল্টা হামলা চালায় ইরান; শুরু হয় যুদ্ধ। দেড় মাস পার হয়েছে; যুদ্ধ চলছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধের কবলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। এখন পর্যন্ত কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন অনেকে।

 

বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল কেন্দ্র উপসাগরীয় ছয়টি দেশে নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ে (রেমিটেন্স) বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন সবাই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রভাব পড়েনি।

 

প্রতিবছরই দুই ঈদকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের বাড়তি খরচ মেটাতে বেশি বেশি রেমিটেন্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। সবাই আশঙ্কা করছিলেন, যুদ্ধের কারণে এবার সেই প্রবাহ কমে যাবে। কিন্তু তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে না।

 

গত ২১ মার্চ দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। এর পরও রেমিটেন্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।

 

মে মাসের শেষের দিকে দেশে ঈদুল আজহা (কোরবানি ঈদ) উদযাপিত হবে। ওই ঈদকে সামনে রেখেও রেমিটেন্স বাড়বে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

 

দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।

 

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৭৫ লাখ (৩০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।

 

গত অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে রেমিটেন্স এসেছিল ২৫২ কোটি ৭৪ লাখ (২.৫৩ বিলিয়ন) ডলার। আর চলতি অর্থবছরের নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) হিসাবে গড়ে এসেছে ২৯১ কোটি ১৯ লাখ (২.৯১ বিলিয়ন) ডলার।

 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ (২৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ২৬১ কোটি (২২.৬১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি (২১.০৩ বিলিয়ন) ডলার।

 

২০২০-২১ অর্থবছরে আসে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি (২৪.৭৮ বিলিয়ন) ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি (১৮.২০ বিলিয়ন) ডলার।

 

রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ছাড়াল

 

ডিসেম্বর ও জানুয়ারির পর গত ফেব্রুয়ারির মাসেও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিটেন্স আসে দেশে। মার্চ মাসে আসে আরও বেশি পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের ইতিহসাসে এর আগে কখনও এমনটি দেখা যায়নি।

 

আর এই রেমিটেন্সের উপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় অবস্থান করছে। এই সূচক নিয়ে আর কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৮ মার্চ রিজার্ভ থেকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদের ১৩৫ কোটি ৮৭ (১.৩৬ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। আর গ্রস বা মোট নেমেছিল ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে।

 

গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।

 

চলতি সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গ্রস হিসাবে উঠেছে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে।

 

নিলামে ডলার কেনা রিজার্ভ বাড়ার আরেকটি কারণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

 

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫৬৫ কোটি ৩৫ লাখ (৫.৬৫ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আরও