Beta
Logo

সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মায়ের সামনেই ‘রেপ’ করার হুমকি দিয়েছিল আমাকে

মায়ের সামনেই ‘রেপ’ করার হুমকি দিয়েছিল আমাকে
রাহেনুর ইসলাম
মঙ্গলবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৫ ১৫:৩৯:০০

 

একটা সময় জাতীয় শুটিং দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তাসমায়াতি এমা আলী। সার্চ কমিটির কাছে নারী শুটারদের নিরাপত্তা চাওয়ার পর থেকে জাতীয় দলের বাইরে তিনি। এ নিয়ে সকাল সন্ধ্যার রাহেনুর ইসলামকে  দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুটিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জি এম হায়দারের বিপক্ষে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন এমা। জানালেন মায়ের সামনে ‘রেপ’ করার হুমকি পাওয়ার কথাও।

 সকাল সন্ধ্যা : অনেক দিন জাতীয় দলের বাইরে আপনি। অথচ আপনার চেয়ে কম স্কোর করা অনেকে এখন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। এর কারণটা কী?

তাসমায়াতি এমা আলী : আপনার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। ৫ আগস্টের পরে যখন ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কার করার জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়, তখন শুটিং ফেডারেশনের নারী খেলোয়াড়দের প্রতিনিধি হয়ে আমি কথা বলতে গিয়েছিলাম। সেখানে নারী অ্যাথলেটদের নিরাপত্তার জন্য জোরালোভাবে তাদেরকে আহ্বান করেছিলাম। যেসব সংগঠকের হতে নারীরা নিরাপদ, দায়িত্ব দিতে বলেছিলাম তাদেরই।

প্রশ্ন : মানে আপনি যে সংগঠকদের অধীনে খেলেছেন তাঁদের কাছে নারী অ্যাথলেটরা নিরাপদ ছিলেন না?

তাসমায়াতি এমা আলী : ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শুটিং ফেডারেশনের বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক জি এম হায়দার সাজ্জাদের সঙ্গে এক নারী পিস্তল শুটারের অডিও রেকর্ড ভাইরাল হয়েছিল। এশিয়ান গেমসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ অনেক কথা বলেছিলেন তিনি। এমন আরও অনেক অভিযোগ আছে। সবাই মুখ ফুটে সব বলতে পারে না, কারণ খেলাটাই তাদের জীবিকা। আমি জি এম হায়দারের নাম উল্লেখ করে কোনো অভিযোগ করিনি, কিন্তু তিনি নিজের উপর টেনে নিয়েছেন সেটা। আর জাতীয় দল থেকে বাদ দিয়েছেন আমাকে।

শুটিং রেঞ্জে তাসমায়াতি এমা আলী। ছবি : এমার ফেসবুক পেজ

প্রশ্ন : জি এম হায়দারই বাদ দিয়েছেন এটা নিশ্চিত হলেন কীভাবে?

তাসমায়াতি এমা আলী : ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসএ গেমস হওয়ার কথা ছিল। এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য তিন বছর অনেক সেক্রিফাইস করেছি আমি। পড়াশোনায় পিছিয়ে গেছি। অথচ ক্যাম্পে আমি ছিলাম না। আমি যে ক্লাবকে প্রতিনিধিত্ব করি, সেখানে যোগাযোগ করলে আমাকে বলা হলো, সার্চ কমিটির সামনে তুমি যে কথা বলেছিলে, এ কারণে বর্তমান কমিটির কর্মকর্তারা তোমার ওপর ক্ষুব্ধ। জি এম হায়দার তোমাকে জাতীয় দলে চান না।

প্রশ্ন: এরপর কি জি এম হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?

তাসমায়াতি এমা আলী : এভাবে বাদ পড়াটা মানতে পারছিলাম না। এরপর আমি জিএম হায়দারের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর অফিসে যাই। তাঁকে বলতে গিয়েছিলাম আমি কারও নাম উল্লেখ করে কিছু বলিনি। এটা তিনি নিজে তার গায়ে টেনে নিয়ে আমাকে এভাবে অপমান করলেন কেন?

আমি সেখানে একা যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। এজন্য আমার মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। অথচ আমার মায়ের সামনেই জঘন্য কথা বলা হয়েছিল আমাকে। তিনি যে বাজে ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলেছেন সেটা ছিল অমানবিক। উনি এটা তদন্ত করতে পারতেন। সেটা না করে যা করলেন, এটা একপ্রকার ক্রাইম।

প্রশ্ন : আপনার মায়ের সামনে কী বলেছিলেন তিনি?

তাসমায়াতি এমা আলী : জিএম হায়দার আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি জানো এনএসসিতে গিয়ে কি করেছ?’ উনার কথা শুনে ভয়ে কাঁপছিলাম। মুখ থেকে কথাই বের হচ্ছিল না। উনি বলে যাচ্ছিলেন, ‘তুমি যে কাজটা করেছ, তাতে আমরা ভাবছিলাম তোমাকে সাসপেন্ড করে দিব। পরে ভেবেছি সাসপেন্ড করে আর কী হবে? তোমাকে আর এখানে রেখেই কী হবে?’

তারপর আমাকে বলেছে এখন যদি তোমাকে ক্যাম্পে নিয়ে আসি, তুমি যে কথাটা বলেছো, তোমার সাথে তো আমার কিছু হয় নাই। তোমাকে তো আমি কিছু করিনি। এখন কমিটিতে যারা আছে তাদের সাথে ডিসকাসনে শুনতে পাওয়া গেছে তুমি এখন ক্যাম্পে এলে তোমাকে ‘রেপ’ও করে দেওয়া হবে। একবার ভাবুন, মায়ের সামনেই ‘রেপ’ করার হুমকি দিয়েছিল আমাকে, অকল্পনীয়। আমার মা তখন স্তম্ভিত আর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

২০২৪ সালে বিএসপিএ বর্ষসেরা পুরস্কার অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশন করেছিলেন তাসমায়াতি এমা : ছবি : সংগৃহীত

প্রশ্ন : এরপর।

তাসমায়াতি এমা আলী : এরপরও তিনি আমার পিছু ছাড়েননি। আমাকে ফোন দেওয়া শুরু করলেন রাত ১১টার পর। ফোনে কুপ্রস্তাব দেননি। তবে বলতেন ক্লাব পরিবর্তন করতে। আমাদের ক্লাবকে নিয়েও বাজে কথা বলেছেন। আমাদের ক্লাবের বেশিরভাগ শুটার নাকি প্রস্টিটিউট। কোন ক্লাবের হয়ে খেলতে হবে জানতে চাইলে তখন আবার চুপ থাকতেন। আমাকে বলতেন, কাদের হয়ে কথা বলেছো তুমি? তোমাকে আমি ভ্যানিশ করে দিতে পারি। কিন্তু আমি তো কোনো পক্ষ বা দলের হয়ে কথা বলিনি। আমি তাদের হয়েই কথা বলেছি যারা নিজেদের অভিযোগগুলো কাউকে বলতে পারছিলেন না। এটা অপরাধ না। আমি আজ থেকে শুটিং না করলেও জীবিকায় কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু ওরা না করলে ঝামেলায় পড়বে। তাই মুখ ফুটে বলতে পারছিল না। এভাবে সবকিছু জানানোয় অনেক ঝড় যেতে পারে আমার উপর দিয়ে। কিন্তু আমার হারানোর কিছু নেই। বিকেএসপি বা কোনো সার্ভিসেস দল থেকে আমি আসিনি। নিজের কোচ আর ক্লাবের তত্ত্বাবধানে জাতীয় দল পর্যন্ত পৌঁছেছি। এখন না হয় অন্য কিছু নিয়ে চেষ্টা করব।

প্রশ্ন: সেই অভিযোগগুলো বলা যাবে কি?

তাসমায়াতি এমা আলী : ১০ টার পরে ফোন নিয়ে নেওয়া হত মেয়েদের।  এরপর সেখানে কী ঘটত, তা বাইরে জানানোর উপায় ছিল না। এক জুনিয়র শুটার আমাকে বলেছে, তার পেছনে ইচ্ছে করে ‘বেডটাচ’ করেছিল একজন। এরপর ‘লেগেই গেছে’ বলে হাঁটা দিয়েছে। শুটিং রেঞ্জে অনুশীলনে এমন ‘ব্যাড টাচ’ প্রায়ই হতো।

এসএ গেমসের ক্যাম্প বন্ধ হওয়ার পর এখন অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বয়সীদের নিয়ে নতুন ক্যাম্প শুরু করেছে। সেখানে বেশিরভাগই মেয়ে শুটার। মেয়েটা বড় বিষয় না, আসল হচ্ছে নিরাপত্তা। এখন তাদের অনৈতিক প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে। আমার আরও একটা অভিযোগ ছিল, যারা এখন জাতীয় দলে আছে তাঁদের বেশিরভাগই ইন্টারক্লাব শুটার। আমার প্রশ্ন ইন্টারক্লাব শুটার কীভাবে জাতীয় দলে আসতে পারে, জাতীয় পদক ছাড়া। আমি চাচ্ছি এটা নিয়ে আরও তদন্ত করুন, সঠিকভাবে তদন্ত করুন। তাহলেই নারীরা নিরাপদ থাকবে।

শুটিংয়ের বাইরে হর্স রাইডিংও পছন্দ করেন এমা। ছবি : এমার ফেসবুক পেজ

প্রশ্ন : আপনি যে অভিযোগগুলো করলেন, প্রমাণ করতে না পারলে তো মানহানির মামলাও হতে পারে আপনার বিরুদ্ধে।

তাসমায়াতি এমা আলী : যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ নিয়েই অভিযোগগুলো করেছি। শুধু আমার কাছে না, সিনিয়র অনেক আপুর কাছেই উনার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে। সবচেয়ে বড় প্রমাণ, আমাদের এক পিস্তল শুটারের সঙ্গে উনার মোবাইলের ভাইরাল কল রেকর্ড তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনও আছে। উনি কি মামলা করবেন, দেখবেন আমাদের কোনো সিনিয়র আপুই উনার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন কিছুদিনের মধ্যে। শুটিং ফেডারেশনে এখন দুই পক্ষ। একপক্ষ যারা সমঝোতা করে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। আরেক পক্ষ যারা নিপীড়িত হচ্ছেন। আমার মতো যারা প্রতিবাদ করছেন তারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এমন হয়রানির ভয়েই ক্রিকেট, ভারোত্তোলন, সাঁতার, ব্যাডমিন্টন খেলা নারী খেলোয়াড়রা খারাপ প্রস্তাব পেলেও চুপ করে থাকেন। কিছু প্রকাশ করতে চান না। আমি প্রকাশ করে দিলাম। এভাবে তো মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গন চলতে পারে না।

প্রশ্ন: সিনিয়রদের সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনার কথা হয়েছে এ নিয়ে?

তাসমায়াতি এমা আলী : ঢাকা রাইফেলস ক্লাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ আছে জিএম হায়দারের বিরুদ্ধে। ঢাকা রাইফেলস ক্লাবের সদস্য মো. আবু সাদেককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনায় মামলাও হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সে মামলায় তিন বছরের সাজা হয়েছিল, করতে হয়েছিল কারাভোগ। সেই জিএম হায়দার আমাদের কয়েকজন সিনিয়র আপুকেও শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছেন। তাঁদের নাম আমি বলতে চাই না। তবে আমার বিশ্বাস, উনারা নিজেরাই প্রতিবাদ করবেন একটা সময়। আমি কাউকে ভয় পাই না। শুটিং থেকে কোনো আয়ও করি না। এটা আমার ভালোবাসা। ঠিক যেমন আমি নাচতে পছন্দ করি। কুল বিএসপিএর অনুষ্ঠানে গত বছর নেচেছিলাম। ঘোড়া চালাতে পছন্দ করি। এর ট্রেনিং নিয়েছি। তেমনি শুটিংও পছন্দ করি। এমন নোংরামির পর আমার মনে হয়েছে এই খেলায় আর থাকাটা ঠিক হবে না।

আরও